
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন। ওই সংগঠনের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ধর্মপরায়ণ নারী ও পুরুষদের জঙ্গিবাদের তালিম দিয়ে দলে ভেড়ানোর পর ‘মিটআপ’ নামের গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করছে এবং সাংগঠনিক নির্দেশনা দিচ্ছে। এই সংগঠনে অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে দুটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে। কার্যক্রমে বাধা দিলে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ এ সদস্যদের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে নিজেদের সাংগঠনিক সামর্থ্যের জানান দিতে ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম এসব তৎপরতা চালাচ্ছে। সম্প্রতি তেজগাঁও কলেজে গোপন বৈঠকের সময় আটক ২৩ জনের মধ্যে রিমান্ডে থাকা ১২ জনের কাছ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা।
পুলিশের দাবি, জঙ্গি মতবাদে বিশ্বাসী ওই সংগঠনের নেতা হাফেজ সালাউল ইসলাম ওরফে হাফেজ ছালাহুল ইসলাম। ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই পুরনো রোহিঙ্গা জামিনে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে পুলিশের খাতা-কলমে ফেরারি আসামি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গ্রেপ্তার ১২ জনের তাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে নতুন জঙ্গি সংগঠন ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, মূলত রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠন হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এদের সদস্য রয়েছে। তবে তাদের মূল কার্যক্রম টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারকেন্দ্রিক।
এই এলাকাকেন্দ্রিক অন্তত ১৬৭ জনের একটি নামের তালিকাও মিলেছে, যারা সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত। তাদের গ্রেপ্তারে এরই মধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের সদস্যদের অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করেন। অনেকে পাহাড়ে আস্তানা গেড়েছেন। সদস্যদের অনেকে অপহরণের সঙ্গেও যুক্ত। আদায় করা মুক্তিপণের একটি বড় অংশই তারা সংগঠনের সদস্যদের পেছনে ব্যয় করে থাকে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জানানো হবে। তবে এই সংগঠনে সঙ্গে যুক্ত যাদের নাম এসেছে, তাদের গ্রেপ্তারে এরই মধ্যে অভিযান শুরু করা হয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও সরকারি কলেজের মসজিদ থেকে জঙ্গি সন্দেহে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১২ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তিন দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয় তাদের।
সূত্রমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০১৯ সালে ১৪টি সশস্ত্র ও জঙ্গি গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। ২০২৬ সালে এসব গোষ্ঠীর সংখ্যা কমে এসেছে। বর্তমানে এখানে ৯টির বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি বা নবী হোসেন বাহিনী, আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন, হালিম গ্রুপ, সাদ্দাম বাহিনী, জাকির বাহিনী, নুর কামাল গ্রুপ ও খালেক গ্রুপ। এছাড়া নবী হোসেনের সহযোগী/উপবাহিনী হিসেবে নাম এসেছেÑ মাস্টার মুন্না বাহিনী, ইসলাম বাহিনী, আবদুল হাকিম বাহিনী, আসাদ বাহিনী, জুবাইর বাহিনী, জাবু বাহিনী, মুমিন বাহিনী, জাকির বাহিনী ও শফিউল্লাহ বাহিনী। এগুলোর বেশিরভাগই ডাকাত গ্রুপ। তাদের মধ্যে আবদুল হাকিম বাহিনী সবচেয়ে তৎপর ছিল। এই বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য যখন-তখন লোকজনকে অপহরণ করত। মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুম করত। ইয়াবা, মানব পাচারে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটাত।
ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের সভাপতি হাফেজ সালাউল ইসলামকে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি গা-ঢাকা দেন। একপর্যায়ে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, তিনি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। এ সময় তার সন্ধানে নামে কাউন্টার টেরোরিজম ও অ্যান্ট্রি-টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা। একপর্যায়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সন্দেহভাজন তৎপরতা চোখে পড়ে। ওই গ্রুপের কিছু সদস্যের ওপর নজরদারির একপর্যায়ে ওই ২৩ জনকে আটক করা হয়। যাদের মধ্যে ১১ জনকে তাদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
সিটিটিসি সূত্র বলছে, ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম ২০১৯ সালের পর থেকে আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা সারা দেশ থেকে সদস্য সংগ্রহ করে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এবং আরাকান দখলের স্বপ্ন দেখে। সরকার যদি তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয়, তাহলে সরকারি স্থাপনায়ও হামলার পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি। তাদের সদস্যরা সাধারণ মুসলমান ও মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের লক্ষ্য করে কাজ করছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তেজগাঁও কলেজের জামে মসজিদ থেকে গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে রয়েছেনÑ মো. শিহাব উদ্দিন, মারজুক আহমেদ, সাইফুর রহমান খান, মো. রাস্মি মিয়া, মো. কামিছুল ইসলাম, মো. সাজ্জাদ হোসেন, আফিফ আহমেদ, মো. মোহাইমিনুল হক, জাওজি চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন, সাকিব আহমেদ ও জুনায়েদ আহমেদ।
গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘মিটআপ
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘মিটআপ’ নামে একটি গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য এবং ওই গ্রুপে তারা উগ্রবাদী কথাবার্তা ও বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করতেন। নাশকতার উদ্দেশ্যে তারা এ গ্রুপ তৈরি করে একত্রিত হয়েছিলেন।
গ্রেপ্তারদের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত উদ্ধার এবং সাইবার তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তাদের কথোপকথন ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে চায় তদন্ত সংস্থা।
‘জিহাদের জন্য লোক সংগ্রহ’Ñ রাষ্ট্রপক্ষের দাবি
আদালতে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার বলেন, “আসামিরা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং জিহাদের জন্য লোক সংগ্রহ করছিলেন।” তাদের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা উদঘাটনের জন্য রিমান্ড প্রয়োজন বলে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়।
অর্থের উৎস নিয়েও তদন্ত
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শুধু যোগাযোগ বা কথিত পরিকল্পনা নয়, উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে অর্থের উৎস নিয়েও তদন্ত করতে চায় সিটিটিসি। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, কথিত উগ্রবাদী কার্যক্রমের অর্থের উৎস এবং অর্থদাতাদের বিষয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী বা সহযোগী রয়েছে কি না, সেটিও শনাক্ত করতে চায় তদন্ত সংস্থা।
ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের সাংগঠনিক তৎপরতা
সংগঠনটি ২০১৬ সাল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয়। সংগঠনের সভাপতি হাফেজ সালাউল ইসলাম ২০১৩ সালে কক্সবাজারের একটি মাদ্রাসায় গোপন বৈঠক করার সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম শহরের একটি হোটেলে পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ আলমসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০১৬ সালে টেকনাফের শামলাপুরে গোপন বৈঠক করার সময় তিনি বিজিবির হাতে আটক হন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, হাফেজ সালাউল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর বারবার তার নাম আরএসও নেতা হিসেবে আসে। তবে তিনি আসলে জঙ্গি সংগঠন ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলামের সভাপতি। তার সঙ্গে যেসব শীর্ষ জঙ্গি নেতা রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে হাফেজ জাবের, হাফেজ মোহাম্মদ ইব্রাহিম, হাফেজ সালামত উল্লাহ, সেলিম শাহেদ ও মোহাম্মদ ওয়াইস অন্যতম। এছাড়াও এই সংগঠনের নেতা মৌলভি আবুল মনজুর, মৌলভি জানি আলম, মৌলভি হামিদ হোসেন ও মৌলভি শফির নাম সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে অর্থ এনে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণের অভিযোগও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক, সৌদি আরব ও সিরিয়ায় তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের অর্থায়নে। মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো মৌলভি মনজুর ও মৌলভি হামিদের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনগুলোর দেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করতে ব্লকভিত্তিক কমিটি করেছে জঙ্গি নেতারা। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা নেতা হিসেবে আলোচনায় চলে এসেছেন আন-রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা আবু সিদ্দিক, মোহাম্মদ নুর, আব্দুল হাফেজ ও নুরুল আমিন।
জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের ডিসি মো. আকতার হোসেন বলেন, “গ্রেপ্তার ১২ জনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেখানে যাদের নাম আসবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। সরকার কোনোভাবেই জঙ্গি তৎপরতাকে ছাড় দেবে না।”
সুত্র, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পাঠকের মতামত