
তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ কিছুতেই থামছে না। নির্মীয়মাণ আটটি রিসোর্ট ভেঙে ফেলতে প্রশাসন সাত দিনের সময় দিয়েছিল। ১১ দিন পরও সেগুলো অক্ষত আছে। আরো দুটি রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, দ্বীপে লোক-দেখানো অভিযান চালানো হয়। বাস্তবে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ সেখানে চলতেই থাকে।
গত ২৭ জানুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিনটি নির্মীয়মাণ রিসোর্ট ভেঙে ফেলা হয়। এ ছাড়া ড্রিমার্স প্যারাডাইস, আটলান্টিক রিসোর্ট ও ফ্রেন্ডস রিসোর্টকে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ভবন ভেঙে ফেলতে সময় দেওয়া হয়। একইভাবে অন্য পাঁচটি রিসোর্টকেও ভবন ভেঙে ফেলতে বলা হয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত একটিও ভাঙা হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘দ্বীপটির প্রতি প্রভাবশালী লোকজনের কী রকম লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে, সেটি অনুধাবন করা যায় ইউএনওর চেয়ারে বসে। সেখানে রিসোর্ট নির্মাণের জন্য নির্মাণসামগ্রী নিতে দেওয়ার জন্য কী পরিমাণ
তদবির-আবদার থেকে শুরু করে, ক্ষেত্রবিশেষে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশনার বিষয়টি বলে শেষ করা যাবে না।’
স্থানীয় লোকজন জানায়, প্রশাসনের কড়াকড়ি থাকলেও টেকনাফের উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন, কোস্ট গার্ড ও বিজিবির টহলদলকে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত নির্মাণসামগ্রী সেন্ট মার্টিন দ্বীপে নেওয়া হচ্ছে। গত রবিবার রাতেও নির্মাণসামগ্রী নিয়ে দুটি বড় আকারের ইঞ্জিনচালিত নৌকা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দিয়ার মাথা এলাকায় যায়। সেখানে দুই সপ্তাহ আগে রিসোর্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, দ্বীপের দিয়ার মাথা নামের এলাকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানেই রয়েছে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। তদুপরি দিয়ার মাথা নামের সৈকত এলাকায়ই সামুদ্রিক কাছিম ডিম পাড়তে উঠে আসে। এলাকাটি একপ্রকার নির্জন ছিল। কিন্তু এখানেও নতুন করে রিসোর্ট নির্মাণের ধুম পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ছেঁড়াদিয়ার উত্তরে দিয়ার মাথা এলাকার প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কেটে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। এরই মধ্যে সিনবাদ এক্সপেরিয়েন্স নামের একটি রিসোর্ট তৈরির কাজ চলছে জোরেশোরে। বিশেষ করে রাতে নির্মাণকাজ চলছে। রাজধানীর হাবিবুর রহমান নামের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি পাঁচ একর জমিতে একের পর এক স্থাপনা করছেন। তিনি কিছুদিন আগেও গাছ-বাঁশের পাঁচটি কটেজ নির্মাণ করেছেন। এক সপ্তাহ আগে বন কেটে ও প্রবাল তুলে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। রিসোর্ট দেখভালের দায়িত্বে থাকা রশিদ আহমদ জানান, রিসোর্টটির মালিক হাবিবুর রহমান। তবে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
মাটির ঘর নামে আরেক রিসোর্টের মালিক নুর আহমেদ। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। নির্মাণাধীন অন্য এক রিসোর্টের মালিক চট্টগ্রামের মো. সাইফুল ইসলাম বিজয়। গত শনিবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সেখানে রিসোর্ট নয়, একটি টিনের ঘর তৈরি করছিলাম। এ রকম নির্মাণকাজেও অনুমতি নিতে হয় জানতাম না।’
বাংলাদেশ সামুদ্রিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং সরকারের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, সেন্ট মার্টিন নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপের কারণে ক্ষতির তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র হোটেল-মোটেল নির্মাণ ও নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। মানুষের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, সেন্ট মার্টিনের অবৈধ স্থাপনাকারীদের সাত দিন নয়, সাত বছর সময় দিলেও তাঁরা নিজ দায়িত্বে অবৈধ স্থাপনা নিজেরা সরাবেন না। কারণ তাঁরা চুরি করে স্থাপনা করেছেন। সময় বেঁধে দেওয়াকে তাঁরা দুর্বলতা মনে করছেন। তাঁরা কাউকে তোয়াক্কা করেন না। তিনি বলেন, এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার নামে লোক-দেখানো অভিযান চালানো হয়। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হচ্ছে না, বরং নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
ইউএনও পারভেজ চৌধুরী বলেন, গত ২৭ জানুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ড্রিমার্স প্যারাডাইস, আটলান্টিক রিসোর্ট ও ফ্রেন্ডস রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে নিজ খরচে স্থাপনা ভাঙতে সাত দিনের সময় দেওয়া হলেও লাভ হয়নি


পাঠকের মতামত