ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ০৬/০১/২০২৬ ৯:৩০ এএম

বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমার। দেড় বছর ধরে এ দুই প্রতিবেশীর সঙ্গেই সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে বাংলাদেশের।

মায়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় নিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে কোনো সাফল্য আসেনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জোর উদ্যোগের কথা শোনা যায়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তৎপরতাও লক্ষ করা যায়। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বেড়েছে।

গত বছর আগস্টে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে যোগ দেন। এতে মায়ানমার ও আঞ্চলিক স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা কেবল কথার জালে বন্দি থাকতে পারি না।

এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।’ তিনি আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও। সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ভাবা এবং তা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সবার যৌথ দায়িত্ব। একই সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গারা যে নিজেদের মাতৃভূমি মায়ানমারের রাখাইনে ফিরতে চায়, সে কথা তুলে ধরে তাদের প্রত্যাবাসনের পথ খুঁজে বের করার অঙ্গীকার জানায় পশ্চিমা বিশ্বের ১১ দেশ। রোহিঙ্গা সংকটের আট বছরপূর্তিতে গত বছরের আগস্টে ঢাকায় দেশগুলোর মিশন এক যৌথ বিবৃতিতে এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেয়।


রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বছর তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। এসব সম্মেলনের আয়োজক জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল বাড়াতে এবং তাদের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক প্রয়াস জোরদার করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আট বছর পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসবের ফলাফল শূন্য। গত বছরের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে ‘অংশীজন সংলাপ : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রাপ্ত বার্তা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে অনুষ্ঠিত হয় রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। আর কাতারের দোহায় ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। কিন্তু এসব সম্মেলনে শুধু আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আর বিচ্ছিন্ন দুটি বিষয় নয়; বরং ক্রমেই তা একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে। মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এ দুটি ইস্যু দেশের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ধরন ও বিস্তৃতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, হেরোইন, আইস ও সিনথেটিক ড্রাগের সহজলভ্যতা সমাজের সর্বস্তরে নীরব ধ্বংস ডেকে আনছে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর সমাজ মাদকের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে, আর কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকা এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলেও এর অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শরণার্থী শিবিরগুলোর আশপাশে অপরাধমূলক তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বাণিজ্যের বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। যদিও সব রোহিঙ্গাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যায় ও অমানবিক, তবু কিছু সংঘবদ্ধ চক্র যে এই অসহায় জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তা বাস্তবতা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

মাদক কারবারিরা রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘সফট স্পট’ হিসেবে দেখছে। সীমান্তের জটিল ভূপ্রকৃতি, সমুদ্রপথ, নাফ নদ এবং জনবহুল শরণার্থী শিবির-সব মিলিয়ে এটি চোরাচালানের জন্য তুলনামূলক সহজ পথ তৈরি করেছে। দরিদ্রতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গা যুবকদের একটি অংশকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে দায় কেবল শরণার্থীদের নয়; বরং দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, যারা টেকসই সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে, মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। বিশেষ করে বান্দরবান ও কক্সবাজার এই দুই জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, থানচি, রুমা এবং উখিয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের কক্সবাজারে নাফ নদ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার প্রাকৃতিক সীমান্ত বা সীমারেখা হিসেবেই পরিচিত। এই নদের পানিতেই জড়িয়ে আছে সীমান্তের রাজনীতি, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াই। এ নদ একদিকে অনেক বাংলাদেশির জীবিকার উৎস, অন্যদিকে ভয় আর বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আগ্রাসনে নাফ নদ পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। অস্পষ্ট সীমান্তরেখার সুযোগে বাংলাদেশের জেলেদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। তাদের মধ্যে কেউ ফিরছেন নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে, আবার অনেকে ফিরছেন না। উপকূলের ঘরে ঘরে কান্না আর অপেক্ষা থামছে না। টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত অনেক জেলে পরিবার এখন অনিশ্চয়তায় বন্দি। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ ছেলে, কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে। সীমান্তের ধূসর বাস্তবতা, আরাকান আর্মির আগ্রাসন ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে নাফ নদ আজ মানবিক বিপর্যয়ের নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারের আরাকান সেনাবাহিনী ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলমান সংঘাত সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বাধ্য। যদি এই সংঘাত সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, চলমান সংঘাতমূলক পরিস্থিতি যদি এখনই সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিলুর রহমানকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি আরাকান আর্মির জন্য করিডর তৈরি করার প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এর তীব্র বিরোধিতা করে। একপর্যায়ে এ উদ্যোগ থেকে সরে আসে সরকার। এখন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান নিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। নির্বাচিত সরকার কীভাবে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবে তা দেখার বিষয়।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পাঠকের মতামত

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে শীতবস্ত্র বিতরণ করলেন ইউএনও রিফাত আসমা 

শীত মৌসুমের তীব্রতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়মুখী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে উখিয়া উপজেলার সিকদার ...

উখিয়ায় রাতের আঁধারে অবৈধ মাটি উত্তোলন, দেড় লাখ টাকা জরিমানা

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ মাটি উত্তোলন ও মাটি কাটার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে একজনকে ...

সালাহউদ্দিন আহমদের নির্বাচনী সম্ভাব্য ব্যয় ৫০ লাখ, উৎস নিজস্ব তহবিল

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নির্বাচনী সম্ভাব্য ব্যয় ...

ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ-‘বন্ধ হোক ঘুষের রাজত্ব’উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতি ও অনিয়মের মহোৎসব

সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের মহোৎসব। সিসিটিভি থাকা সত্ত্বেও ...