ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১০/০৮/২০২৬ ৮:০০ এএম

মিয়ানমারের স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি দুই শতাধিক বাংলাদেশি
মিয়ানমারের স্ক্যাম সেন্টারে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছেন আমজাদ হোসেন। তিনি রাজবাড়ীর বাসিন্দা।

থাইল্যান্ডে মাইগ্রেশন ওয়ার্কারদের সহযোগিতায় তিনি এখন চিকিৎসাধীন। মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে ফিরলেও ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
আমজাদ হোসেনের সংসারে স্ত্রী ও এক মেয়ে। একসময় ব্যবসা করতেন তিনি।

তিনি জানান, ব্যবসায় বড়মাপের লোকসান হওয়ার পর ঋণের বোঝা তৈরি হয়। ঋণ শোধ করতে বিদেশে গিয়ে ভালো বেতনের চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিদেশে চাকরির আশায় নয়াপল্টনের এইচই ট্রাভেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আমজাদ। তাঁকে বলা হয়, লাওসে কম্পিউটার পরিচালনার কাজ দেওয়া হবে।

বেতন ভালো, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। এ জন্য এজেন্সিকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দেন তিনি। এক মাসের মধ্যে বিদেশ পাঠানোর কথা থাকলেও অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ৮-৯ মাস। অবশেষে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে লাওসে পাঠানো হয়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়েই তিনি সে দেশে গেছেন।

কিন্তু লাওসে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় আমজাদের স্বপ্নের গল্প। সেখানে যাওয়ার পর প্রায় এক মাস এজেন্সির সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে আমির ও সাজ্জাদ নামের দুজনের মাধ্যমে তাঁকে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। তখনই জানতে পারেন, চাকরির জন্য নয়, তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

যে কাজের কথা বলে তাঁকে নেওয়া হয়েছিল, তার বদলে নারী সেজে পুরুষদের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে বাধ্য করা হয়। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে করা হতো নির্যাতন। প্রায় তিন মাস কাজ করেও কোনো বেতন পাননি আমজাদ। এরপর তাঁকে আবার বিক্রি করে পাঠানো হয় মিয়ানমারে। মিয়ানমারে নেওয়ার পথটিও ছিল ভয়ংকর। নৌকা ও প্রায় ১৯টি গাড়ি বদল করে তাঁকে পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়। চারদিকে নিরাপত্তা ও নজরদারির মধ্যে দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। সামান্য ভুল হলেই চলত মারধর ও ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মতো নির্যাতন।

গত মাসের ১৫ তারিখে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেন আমজাদ। ধরা পড়ায় চলে অমানুষিক অত্যাচার। মৃতপ্রায় অবস্থায় জঙ্গলে ফেলে গেলে আরেকজন পাচারকারীর মাধ্যমে থাইল্যান্ডে পৌঁছান। প্রায় দুই দিন না খেয়ে ছিলেন। পরে এক অস্ট্রেলীয় মানবাধিকারকর্মীর সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয় পান এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। এখন আমজাদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, ভাঙা আঙুল। মাথায় প্রায় ৩০ লাখ টাকার ঋণ।

মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, আমজাদের মতো আরো দুই শতাধিক বাংলাদেশি মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে আছেন। এখন পর্যন্ত ছয়জন বাংলাদেশি সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন থাইল্যান্ডের মেসোট শহরে পৌঁছেছেন। গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তাঁরা মেসোট অভিবাসন পুলিশের কাছে মানবপাচারের শিকার হিসেবে আত্মসমর্পণ করেন। বর্তমানে তাঁদের জাতীয় পুনর্বাসন ব্যবস্থার আওতাধীন একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। চারজনের মধ্যে একজন শারীরিক নির্যাতনের কারণে অসুস্থ থাকায় মেসোটের একটি বেসরকারি সংস্থার নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। অন্য দুই বাংলাদেশি মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে আছেন, অপেক্ষা করছেন থাইল্যান্ডে ঢোকার।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশি নয়, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের তিন হাজারের বেশি পাচারের শিকার ব্যক্তি ওই স্ক্যাম কম্পাউন্ড এলাকায় আটকে আছেন। মিয়ানমারের ওই স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি চীনা নিয়ন্ত্রিত স্ক্যাম প্রতিষ্ঠান বা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটকে রেখে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের দেওয়া কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর একটি বৃহৎ এলাকা জুড়ে ভবন তৈরি করে সেখানেই চলে এই স্ক্যাম সেন্টার। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায় সেখানকার ভুক্তভোগীদের ওপর চলা নির্যাতনের চিত্র। তাঁরা জানান, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ মিনিট কথা বলতে মোবাইল দেওয়া হয়। কেউ সেখান থেকে বের হতে চাইলে চাওয়া হয় মুক্তিপণ। আর কথার অবাধ্য হলে চলে অমানুষিক নির্যাতন। দেওয়া হয়, ইলেকট্রিক শক, খাবার দেওয়া হয় না দিনের পর দিন। বাধ্য হয়েই করতে হয় তাদের নির্দেশিত সব কাজ।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল-আমিন নয়ন মিয়ানমারের স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে পালিয়ে আসা বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচি।

আল-আমিন নয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমারের স্ক্যাম কম্পাউন্ড এলাকা থেকে সরাসরি বাংলাদেশে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে আগের মতো থাইল্যান্ড হয়ে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনসুলেটের সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধার, নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনে রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিষয়টিকে শুধু প্রত্যাবাসন ইস্যু হিসেবে না দেখে বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন আন্তর্দেশীয় মানবপাচার ও সাইবার অপরাধের তদন্ত হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসা ছয়জনকে সুরক্ষিত ভুক্তভোগী হিসেবে রেখে তাঁদের ডিজিটাল, আর্থিক ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটক বাংলাদেশিদের যাচাইকৃত তালিকা ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে হবে। এরপর থাইল্যান্ডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।’ এ বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ কর্মকর্তাদের কল দেওয়া হলেও কেউ উত্তর দেননি।

সুত্র,কালের কন্ঠ

পাঠকের মতামত

Single Page Footer