

বঙ্গোপসাগরের টেকনাফ-উখিয়ার উপকুলের সৈকত এলাকা থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করে প্রতিনিয়ত পাচার করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে শামুক-ঝিনুক আহরণ এবং পাচার করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিরব ভুমিকা রাখায় পাচারচক্র দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এক সময় চুপিসারে শামুক-ঝিনুক অহরণ করে নিরবে পাচার করা হতো। সময়ের আবর্তে প্রকৃতিক এই সম্পদ প্রকাশ্যে আহরণ করা হচ্ছে। আহরিত শামুক-ঝিনুক বৈধ ব্যবসার মতো সমুদ্রপাড়ের উন্মুক্তস্থানে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানাযায়, সাগরের শামুক-ঝিনুক মুরগীর ফিড তৈরীতে গুরুত্বপুর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কারণেই উপকুলের শামুক-ঝিনুকের কদর আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। চাহিদার কারণেই বঙ্গোপসাগরের সৈকতে শামুক-ঝিনুক আহরণ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে। তেমনি পাচারও সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানাগেছে। এদিকে উপকূলীয় বনবিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের খামখেয়ালীপনার কারণে টেকনাফ উপকুলের শামুক-ঝিনুক অবাধে পাচার হচ্ছে বলে জানাগেছে। এভাবে শামুক-ঝিনুক পাচার অব্যাহত থাকলে প্রকৃতি ও পরিবেশের যেমন ক্ষতি হবে। সাগরপাড়ের শামুক-ঝিনুক অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। সাগরপাড়ের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন। পরিবেশবিদ ও সচেতন সমাজের মতে টেকনাফ উপকুল দিয়ে শামুক-ঝিনুক আহরণ ও পাচার বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, টেকনাফ উপকুলের নোয়াখালীয়াপাড়া, কচ্ছপিয়া, বড় ডেইল, মারিশবনিয়া, মাথাভাঙ্গা, হাজমপাড়া, উখিয়া উপকুলের পাটুয়ারটেক ও ইনানী সৈকতসহ ৮টি পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত শামুক-ঝিনুক আহরণ করা হচ্ছে। এছাড়া শাহপরীর দ্বীপ ও সাবরাং উপকুলের সৈকত থেকে কেবল শামুক আহরণ করে একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাচার করা হচ্ছে। উপকুলের সৈকত থেকে আহরিত শামুক-ঝিনুক বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া গ্রামের ইলিয়াছ ট্রাকে করে পাচার করছেন। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে উপকূলের এই শামুক-ঝিনুক পাচার করে আসছেন। ইলিয়াছ কচ্চপিয়া গ্রামের মৃত নজির আহমদের ছেলে বলে জানাগেছে। যতদুর জানাগেছে, ইলিয়াছই উপকুলের সব পয়েন্ট এলাকা থেকে আহরিত শামুক-ঝিনুক পাচারের মুল হোতা। ওপেন সিক্রেট ঝিনুক-শামুক পাচার করে আসলেও এ সংক্রান্তে তার বিরুদ্ধে নেই কোন মামলা-মোকাদ্দমা। স্থানীয়রা বলছেন, এই কারণেই তিনি (ইলিয়াছ) হয়ে গেছেন আরো বেপরোয়া। অনুসন্ধানে জানাগেছে,পাচার চক্রের হোতা ইলিয়াছ প্রতি বস্তা শামুক-ঝিনুক ১০০-১২০ টাকায় সংগ্রহ করেন। আর এই শামুক-ঝিনুকের বস্তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তিনি নেন ৫০০-৬০০শ টাকায়। মাসে কয়েকটি চালান ট্রাকে করে পাচার করেন। এভাবে বছরজুড়ে শামুক-ঝিনুক আহরণ ও পাচার অব্যাহত রেখেছেন।
লোকজন সুত্র জানায়,সমুদ্র পৃষ্টের তলদেশ থেকে শামুক-ঝিনুক উপকুলে ভেসে আসে। বর্ষা এবং শুস্ক মৌসুমসহ সারাবছর শামুক-ঝিনুক আসতে থাকে। ভেসে আসা শামুক-ঝিনুক সৈকতের পাথর এবং বালিয়াড়ীর সাথে মিশে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শামুক-ঝিনুক উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপুর্ণ অংশ। জীবিত শামুক ও ঝিনুক সামুদ্রিক খাদ্য শৃংখল বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। কিছু প্রজাতির ঝিনুক পানি ছেঁকে ক্ষুদ্র কণা অপসারণে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, খালি খোলস বালু ও পলির সঙ্গে মিশে সৈকতের প্রাকৃতিক গঠন এবং উপকূলীয় আবাসস্থল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সৈকত থেকে নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হলে, বিশেষ করে জীবিত প্রাণী আহরণ বা বালু খুঁড়ে খোলস তোলা হলে, সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যশৃংখল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা থাকে। বঙ্গোপসাগরের সৈকত থেকে শামুক-ঝিনুক আহরণ বন্ধে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা। পাশাপাশি পাচারে জড়িত ইলিয়াছের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছেন তারা।
শামুক-ঝিনুক পাচারে জড়িত ইলিয়াছের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে শামুক-ঝিনুক পাচারের বিষয়ে প্রশ্ন করার সাথে সাথে তিনি তার মোবাইল ফোন কেটে দেন।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংবাদিক নেতা দীপক শর্মা দীপু বলেন, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি সৈকতের ভাঙ্গন রোধেও শামুক-ঝিনুক গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে। এভাবে শামুক-ঝিনুক আহরণ হলে সমুদ্রের সৌন্দর্য্য বিনষ্টের পাশাপাশি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে তিনি মনে করেন।
উপকুলীয় বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসাইন জানান,আমি তো সবেমাত্র যোগদান করেছি। তবে এত্তগুলা চেকপোষ্ট থাকতে কেমনে শামুক-ঝিনুক পাচার হবে? তা রীতিমতো তাঁকে ভাবিয়ে তুলছেন। টেকনাফ উপকুলের শামুক-ঝিনুক আহরণ ও পাচার বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীকে কাজ করতে হবে বলে এই রেঞ্জ কর্মকর্তা মনে করেন। এ বিষয়ে জানতে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত) জমির উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। পরিচয় জানবার পর ব্যস্ত আছেন মর্মে পরে কথা বলবেন বলে তিনি মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন।##

পাঠকের মতামত