প্রকাশিত: ২০/০৩/২০২১ ৯:২৪ এএম , আপডেট: ২০/০৩/২০২১ ৯:২৫ এএম

মাদক কেনাবেচার কৌশল হিসেবে এক ব্যবসায়ী ছোট্ট ইয়াবা বড়ির সাংকেতিক নাম দিয়েছেন ‘কাপড়-চোপড়, গেঞ্জি’ ও ‘কংক্রিট’। লাল বড়িকে সম্বোধন করেন ‘লাল-কাপড়’ আর গোলাপি বড়িকে ‘গোলাপি-কাপড়’। কক্সবাজার থেকে মাদকের চালান আসাকে ‘কংক্রিট’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

কোনো বিক্রেতার কাছে মাদক বিক্রির পাওনা টাকা চাওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘বাজার-সদায় করতে হবে। এখনই পাওনা টাকা হাতে পেলে উপকার হয়।’ অনেক পার্টির হোয়াটস অ্যাপে ইয়াবা ট্যাবলেটের ছবি পাঠিয়ে তার গুণগত মান যাচাই করতে বলেন তিনি। এরপর শুরু করেন দরদাম নিয়ে দেনদরবার। এই চতুর কারবারি হলেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নাহিদুল ইসলাম সুমন। তিনি তার নিজ হাসপাতালে বসেই দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কেনাবেচার বড় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। বর্তমানে তিনি কর্মরত রয়েছেন কামরাঙ্গীরচর সরকারি ৩১ শয্যা হাসপাতালে। সমকালের অনুসন্ধানে সুমন ও তার চক্রের ইয়াবা বেচাকেনার চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে।

০১৯১০-৪২০৮০৮ এই নম্বর থেকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সাংকেতিক ভাষায় কথোপকথন চলে সুমনের। এই নম্বরটি তার প্রকৃত নাম-পরিচয়, ঠিকানা দিয়েই নিবন্ধন করা। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় দুটি ফার্মেসিতে চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখেন তিনি। তাই এলাকাবাসীর কাছে সুমন ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। মাদক কারবারিরাও ফোনে ‘ডাক্তার ভাই’ বলে সম্বোধন করেন।

কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সুমনের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার আদিয়াবাদ। তার বাবার নাম শাহাবুদ্দিন ও মায়ের নাম নাজমা আক্তার। বর্তমানে পরিবার নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে বসবাস করছেন তিনি। বছরখানেক আগে নরসিংদী থেকে কামরাঙ্গীরচরে সরকারি হাসপাতালে বদলি হয়ে আসেন তিনি। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ইয়াবার জগতে তার রমরমা ব্যবসা। ইয়াবার চালান আনতে প্রায়ই সুমন ছুটে যান কক্সবাজারে। একাধিক মোবাইল নম্বর, হোয়াটস অ্যাপস ও মেসেঞ্জারে বিভিন্ন পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেই ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর নিজের হাসপাতালের ভেতরে ডেকে নিয়ে ইয়াবা বড়ির বড় বড় চালান পার্টিকে বুঝিয়ে দেন। কখনও আবার নিজের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সুমন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা হিসেবে ইয়াবা ক্রেতার কাছে পৌঁছেও দেন। অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে ইয়াবার পুরো কারবার সামলাচ্ছেন তিনি।

কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হওয়ায় কেউ তাকে সন্দেহ করে না। কিন্তু মাদক বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছেন সুমন। একাধিক পৃথক মোবাইল নম্বর থেকে নিয়মিত ইয়াবা কেনাবেচায় বিভিন্ন পার্টির সঙ্গে সাংকেতিক ভাষায় যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। এমন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সমকালের হাতে রয়েছে। ফোনে প্রায় সব ইয়াবা ক্রেতা তাকে ডাক্তার সম্বোধন করে বলেন, ‘কাপড় লাগবে’। উত্তরে সুমনও বলেন, ‘লাল কাপড় বেশি ভালো। সেটা হাতে রয়েছে।’ গোলাপি কাপড় হলে প্রতি পিস ১১৫ টাকা ও লাল কাপড় ১২০ টাকা। এভাবে কথোপকথন চলে।

ঢাকার বেশকিছু স্থানে বসে সুমন কারবার করেন। এরমধ্যে কামরাঙ্গীরচরের হাসপাতাল, ঢাকার মনোয়ারা হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের এলাকা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও নিজ জন্মস্থান নরসিংদী। কোনো পার্টির কাছে বিক্রির বিষয় চূড়ান্ত হলেই মোটরসাইকেলে সেখানে চলে যান সুমন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের চায়ের দোকানে গোপনে একাধিক চালান হস্তান্তর করেছেন। যেসব পার্টি তার কাছ থেকে প্রায় নিয়মিত ইয়াবার ছোট-বড় চালান ক্রয় করেন, তারা হলেন খিলগাঁওয়ের মো. ফারুক ও ডেমরার মনির। সর্বশেষ ৬ মার্চ ফারুক একটি নম্বর থেকে সুমনের কাছে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে ইয়াবার জন্য যোগাযোগ করেন। তাদের দু’জনের মধ্যকার কথোপকথনের কিছু তথ্য সমকালের হাতে এসেছে। সেখানে তাদের বলতে শোনা গেছে, ইয়াবা বড়ি চাওয়ার পর সুমন বলছেন- ‘ক্যাশ টাকা নিয়ে অথবা বিকাশে পেমেন্ট দিতে হবে। টাকা পাওয়ার পর বড়ি হস্তান্তর করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগবে।’ তবে ওই দিন ঢাকায় একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ঘিরে রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি বেশি থাকায় ফারুক শেষ পর্যন্ত সুমনকে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় আসতে নিষেধ করেন। কথোপকথন থেকে জানা যায়, সুমনের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০ হাজার ট্যাবলেট নিয়ে বিক্রি করতেন ফারুক। এতে মোট ৫০ হাজার টাকা লাভ হয় তার। তার মধ্যে ফারুক নেন ২০ হাজার ও সুমন পান ৩০ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে সুমনের কাছ থেকে ইয়াবা কেনার বড় পার্টি আছে ১৫-২০টি। এরমধ্যে অন্যতম শনিরআখড়ার মনির হোসেন। এছাড়া ০১৪০৬৪৪৫৫৭১ নম্বরে সাদ্দামের সঙ্গে সুমনের মাদক কেনাবেচার রেকর্ড আছে। তার বড় ক্রেতার নাম জনৈক আলমগীর। ০১৭০৭৭০৪৮৬৮ নম্বরে আলমগীরের সঙ্গে তার ইয়াবা কারবার চলে। শহীদ ও রুবেল নামে দু’জন বিশ্বস্ত সহযোগীর মাধ্যমেও ইয়াবা বিক্রি করেন সুমন। তাদের মাধ্যমে নরসিংদীর বেলাব ও রায়পুরা এলাকায় মাদকের নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। অধিকাংশ সময় ৩০-৩৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ নিয়ে মাদক পার্টির কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেন সুমন।

এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি এক পার্টির সঙ্গে সুমনের যোগাযোগ হয়। রাজধানীর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় তাকে ১০ হাজার বড়ি দেওয়ার ব্যাপারে ফোনালাপ হয়। পরে নগদ অর্থের বিনিময়ে ওই চালান হস্তান্তর করেন সুমন।

সুমনের গতিবিধি ও কার্যকলাপের ওপর কয়েকদিন ধরে নজর রাখেন সমকালের এ প্রতিনিধি। দেখা যায়, ইয়াবার একটি বড় চালান ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করতে সর্বশেষ গত ১০ মার্চ বিমানযোগে সকাল ৮টার দিকে কক্সবাজার যান সুমন। এরপর তিনি উখিয়ায় কারবার সেরে ১৪ মার্চ রাতে ঢাকায় ফেরেন। কক্সবাজার অবস্থানকালে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে প্রথমে মাদক কেনাবেচার আড়াই লাখ টাকা গ্রহণ করেন সুমন। যার মধ্যে ফারুকের কাছ থেকে নেন ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া আরও দু’জনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা।

হাসপাতালের দৃশ্যপট: সুমনের ব্যাপারে সরেজমিনে খোঁজ নিতে গত ১৬ মার্চ রাত ৯টার দিকে কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল গেট তালাবদ্ধ। ভেতরে আলো-আঁধারি পরিবেশ। কিছু সময় ডাকাডাকির পর এক তরুণী বেরিয়ে আসেন। পরে জানা যায়, তার নাম নুরুন্নাহার। ওই হাসপাতালের আয়া হিসেবে কর্মরত। নুরুন্নাহার সমকালকে বলেন, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে ওই হাসপাতাল। এরপর রোগী দেখা হয় না। সরকারি হাসপাতাল হলেও পুরোপুরি এটি চালু হয়নি। তাই রোগী ভর্তিও নেওয়া হয় না। কেবল আউটডোরে চিকিৎসা দেওয়া হয়। নুরুন্নাহারের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন-দু’জন ব্যক্তি ওই আলো-আঁধারি পরিবেশে হঠাৎ উপস্থিত হন। একজনের হাতে একটি রহস্যজনক পুঁটলি। তার ভেতরে কী রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছিল না। নাম-পরিচয় জানতে চাইলে একজন প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে নিজেকে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নাহিদুল ইসলাম সুমন বলে পরিচয় দেন। হাসপাতাল খোলা না থাকলেও রাতে সেখানে কী করছেন এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে যান সুমন। এরপর দাবি করেন, হাসপাতালের কমপাউন্ডে বসবাস করছেন, এমন একটি বাসায় রাতে খাবারের জন্য নিমন্ত্রণ রয়েছে তার। এ সময় মাদক কারবার নিয়ে সুমনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের বিস্তারিত আলাপ হয়।

সুমনের বক্তব্য: মাদক কারবারে জড়িত তার থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে সুমন প্রথমেই বলেন, ‘নাউজুবিল্লাহ। আমি এমন কাজে জড়িত নই। কেউ ষড়যন্ত্র করছে আমার বিরুদ্ধে। ইয়াবা বড়ি কেমন তা আমি জীবনেও দেখিনি। হয়তো এখানে আর আমার চাকরি করা হবে না।’

ইয়াবা কারবার করতে মার্চে কক্সবাজার যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে সুমন বলেন, ‘বছরে দুইচার বার এদিক-ওদিক যাই। মার্চেও কক্সবাজার গিয়েছি। তবে মাদক কারবারি করতে যায়নি।’ একটি মোবাইল নাম্বারে বহু মাদক কেনাবেচার কথোপকথন রয়েছে। সে বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন দাবি করেন, কামরাঙ্গীরচরে যে ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখেন, তাদের অনেককে তার ০১৯১০-৪২০৮০৮ নম্বরটি দেওয়া আছে। তারা মাঝেমধ্যে ফোন করেন। ফোনে অনেক রোগী অনেক কথা তো বলে।’ এরপরে একাধিকবার এই প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বরে ফোন করে সুমন জরুরিভাবে দেখা করতে চান। ফোনে অনৈতিক প্রস্তাবের ইঙ্গিত দেন।

কামরাঙ্গীরচরের ৩১ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শিমুল তালুকদার সমকালকে বলেন, রাতে তো আমাদের হাসপাতাল বন্ধ থাকে। তাই রাতে সেখানে সুমনের উপস্থিত থাকার কথা নয়। চলতি মাসে তার কক্সবাজারে যাওয়ার বিষয়টি জানা নেই। যদি মাদক বিক্রির মতো ঘটনায় তার নাম আসে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুত্র : সমকাল

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত: সেনাপ্রধান

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ...

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বারোটা বাজিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই আগের সরকার প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে ...

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াটাও কঠিন হয়ে যাবে একদিন: বিদ্যুৎমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ...

রোহিঙ্গাদের জন্য আরও সুইডিশ সহায়তা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাংলাদেশে আরও বেশি সুইডিশ সহায়তা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ...
Single Page Footer