প্রকাশিত: ০১/০৪/২০১৭ ৯:১২ এএম

মোয়াজ্জেমুল হক/ এইচএম এরশাদ ॥ মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযানে যে রক্তস্রোত বয়ে গেছে এবং এদের একটি বড় অংশকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে ব্যাপকভাবে যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে বাস্তবতা অনুধাবন করে জাতিসংঘ এর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গার প্রাণহানি, লাখ লাখ রোহিঙ্গার দেশান্তরী হওয়ার পথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার ঘটনাবলী একদিকে যেমন লোমহর্ষক তেমনি হৃদয়বিদারকও। মানবিকতার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশকে আশ্রয় দেয়ার ঘটনাটি এখন পরিণত হয়েছে বড় ধরনের মুসিবতে।

সেই ১৯৬২ সালে তৎকালীন বার্মার জেনারেল নে উইনের সরকার আমল থেকে আরাকান (বর্তমানে রাখাইন) প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা খেদাও অভিযান শুরু হয়েছে বর্বরোচিত কায়দায়। অর্থাৎ, হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, বাড়িঘর জ্বালাও পোড়াওসহ বিভিন্ন অমানবিক ও হিংস্র পদ্ধতিতে। সেই থেকে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আগমন। সর্বশেষ দলে দলে না হলেও কখনও একক আবার কখনও পরিবার বা দলগতভাবে ওরা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। তৎকালীন পাকিস্তান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এসব রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিকতা প্রদর্শন করে তাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। সরকারী হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা এখন ৫ লক্ষাধিক বলা হলেও বেসরকারীভাবে তা এখন ১৩ লাখে উন্নীত হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা নরনারী ও শিশু এসেছে ৯০ হাজারেরও বেশি।

মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলা জুড়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গায় সয়লাব হয়ে আছে। শুধু কক্সবাজার এলাকা নয়, বান্দরবানের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও এরা স্থায়ী বসতি গেড়েছে। পরবর্তীতে ছড়িয়ে গেছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। অর্ধ শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে একেবারে অশিক্ষিত এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এদেশে জঙ্গী সন্ত্রাসসহ চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, মানব পাচারসহ হেন কোন অপকর্ম নেই যেখানে এরা জড়িয়ে পড়ছে না। এ অশিক্ষিত রোহিঙ্গাদের উৎসাহ দিচ্ছে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন। এর পাশাপাশি এদেশের কিছু এনজিও সংস্থা। বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা বিষয়টি আলোচনায় আসার পর সর্বশেষ গত শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের অমানবিক আচরণের বিষয়টি তদন্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রাখাইন প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনী, সীমান্তরক্ষী এবং পুলিশের দ্বারা রোহিঙ্গা হত্যা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ একটি সত্যানুসন্ধান মিশন প্রেরণে একমত হয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে জাতিসংঘে নিয়োজিত মিয়ানমার প্রতিনিধি এ ব্যাপারে বিরোধিতা ও তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ প্রস্তাব উত্থাপন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতে সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি বিশ্ব গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সরকারের আচরণ মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। ইয়াংঘি লি অতিসম্প্রতি সরেজমিনে বাংলাদেশের উখিয়া, টেকনাফে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থান প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে মানবেতর জীবনে পড়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবশ্য এ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এরপরই গত শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ কোন ধরনের ভোটাভুটি ছাড়াই সত্যানুসন্ধানে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা কত তার সুনির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকার পক্ষে এ সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে বলা হয়ে থাকে। অথচ, বেসরকারীভাবে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। পাশাপাশি সে ১৯৬২ সাল থেকে দলে দলে পালিয়ে আসার পর এদের পরিবারে জন্ম নিয়েছে শত শত রোহিঙ্গা শিশু। এরা এখন পূর্ণ বয়সে পড়েছে। সরকারী তথ্য অনুযায়ী গেল বছর কক্সবাজারসহ ৬টি জেলায় রোহিঙ্গাদের শুমারি হয়। এ ব্যাপারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উদ্যোক্তা হামিদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রোহিঙ্গারা বর্তমানে কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের আপদ হয়ে আছে। ভবিষ্যতে পুরো দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, অশিক্ষিত এ জনগোষ্ঠীকে সাহায্য সহযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন অপকর্মে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তার সর্বশেষ উদাহরণ জঙ্গী সন্ত্রাসে এদের অনেকে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য । সুত্র জনকন্ঠ

পাঠকের মতামত