প্রকাশিত: ১৩/১১/২০২০ ১১:৫৪ এএম

এইচএম এরশাদ ::
বিশ্বের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সফরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় অধিবাসিরা। ভাসানচরের অবকাঠামো পরিদর্শন নয়, আগে ১২লাখ রোহিঙ্গার গাদাগাদি বসবাস ও স্থানীয়দের ক্ষয়-ক্ষতি পরিদর্শনে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে ওই প্রতিনিধিদের।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ভাসানচরের অবকাঠামো পরিদর্শন করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুমতি চেয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক পাঁচটি মানবাধিকার সংস্থা চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সর্দার মাতব্বরগণ বলেন, গাছপালা, পাহাড়-টিলা কেটে সাবাড় ও পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা যে পরিমাণ লোকাল বসতিদের ক্ষতিসাধন করেছে, তা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। সরকার রোহিঙ্গাদের গাদাগাদি বসবাস ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে রক্ষা করতে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সবার জন্য বসবাস উপযোগি করে তুলেছে ভাসানচরকে। ইতোপূর্বে একাধিক সংস্থা এবং রোহিঙ্গা নেতারা সরেজমিনে ভাসানচর পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হলে কতিপয় এনজিও এবং রোহিঙ্গা নেতাদের (আরএসও) নানাভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেই তারা ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তরে বিরোধীতা করে আসছে। ইতোপূর্বে কতিপয় মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে না পাঠাতে বিবৃতিও প্রদান করিয়েছেন ওই স্বার্থান্বেষী মহল।
সূত্র জানায়, উখিয়া টেকনাফে যেসব জায়গায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরের অবস্থান, সেখান থেকে পায়ে হেঁটেও মিয়ানমারে পার হওয়া যায়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে গিয়ে সেখান থেকে অস্ত্র, স্বর্ণ ও ইয়াবার চালান এনে ঢুকাচ্ছে আশ্রয় শিবিরে। অস্ত্রগুলো ক্যাম্পে জমা করছে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা। ইয়াবা ও স্বর্ণের চালান পরবর্তীতে সরবরাহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলে ওই অবৈধ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে রোহিঙ্গারা। শিবিরে অবাধ যাতায়াত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে পুরনো রোহিঙ্গা নেতারা। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলে মনোরঞ্জনসহ হরেক রকমের বিলাসী জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত হতে পারে কতিপয় বিদেশী এনজিও প্রতিনিধিরা। বর্তমানে পাঁচতারকা মানের হোটেলে অবস্থান করে বিদেশী সংস্থার কতিপয় প্রতিনিধি সকালে বের হয়ে ৪৫মিনিটের মধ্যে আশ্রয় শিবিরে পৌছে বিকেলে ফিরে আসতে পারছে তারকামানের হোটেলে। যেখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। তবে ভাসানচরে তারকামানের হোটেল গড়ে না উঠলেও সেখানে বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিদের থাকা ও খাওয়ার পরিবেশ সন্মত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা ভাসানচরের অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা ও সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিন ঘুরে দেখতে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনকে যৌথভাবে চিঠি দিয়েছে বিশ্বের পাঁচটি মানবাধিকার সংস্থা। সূত্র জানিয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, রিফ্যুজিস ইন্টারন্যাশনাল, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস, ফর্টিফাই রাইটস ও আসিয়ান পার্লামেন্ট ফর হিউম্যান রাইটসের প্রতিনিধিরা যৌথ চিঠিতে সই করেছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা ভাসানচরের অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা ও সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিন ঘুরে দেখতে চান তারা। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার ভাসানচরে বসবাস উপযোগি অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। এখানে চলচাতুরি কিছু নেই। বারবার রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, বিদেশী এনজিও প্রতিনিধি ও বিশ্বের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের পরিদর্শনের কী আছে। সবাই পরিদর্শন করতে পারেন তাতে সমস্যা নেই মোটেও। তবে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে এবং মিয়ানমারে না পাঠানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে স্বার্থান্বেষীরা কিছু তালবাহনা শুরু করেছে। রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে যারা স্বার্থ হাসিলে মগ্ন, মুলত তারাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম দীর্ঘায়িত এবং তাদের ভাসানচরে না পাঠানোর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মানবিক কারণে সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। গত ৩০বছর ধরে সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার পরিচয় দিয়েছে। যা বিশ্বের কাছে প্রধানমন্ত্রী সহ প্রশঙসিত বাংলাদেশ। গত ৩বছরের চেয়ে বেশী সময় ধরে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্টী উখিয়া টেকনাফ এলাকায় গাদাগাদি ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে সরকার তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই আশ্রয় শিবির-অবকাঠামো নির্মাণ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবে এটাই নিয়ম। এতে কারও নাকগলানোর প্রয়োজন নেই বলে মত প্রকাশ করেন এই নেতা।
এদিকে ভাসানচরে রোহিঙ্গারা যেন স্থানান্তর না হয়, এ নিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন এনজিও গুলো রোহিঙ্গাদের উস্কানি দিচ্ছে। অতীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কর্মকান্ড নিয়েও ক্যাম্পগুলোতে উস্কানি ছড়ানো হয়েছিল। ফলে গত তিন বছরের বেশী সময় ধরে মিয়ানমারে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করা যায়নি। একইভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে ভাসানচরে না যেতে। চরটিতে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পরিদর্শনের জন্য যে ৪০ জন রোহিঙ্গা মাঝিকে (নেতা) সফরে নেয়া হয়েছিল, ভাসানচরের অবকাঠামো দেখে তারা রীতিমত মুগ্ধ হলেও ক্যাম্পে ফিরে এসে সন্ত্রাসীদের ভয়ে এবং বিদেশী এনজিও প্রতিনিধিদের ষড়যন্ত্রে তারা ভাসানচরে না যেতে বলছে সাধারণ রোহিঙ্গাদের।
সূত্র জানায়, কোনো রোহিঙ্গা যাতে ভাসানচরে না যায়, সে বিষয়ে গোপনে একটি চক্র মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। ভাসানচর বসবাসযোগ্য নয়, যে কোনো সময় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এই চর ডুবে যেতে পারে, এই চরে যাওয়া যাবে না এ ধরনের নেতিবাচক বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে ক্যাম্পে। রোহিঙ্গাদের ৪০ সদস্যের প্রতিনিধি দল গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ক্যাম্পে ফেরত আসে। ভাসানচরে অবস্থানকালে ইতিবাচক মন্তব্য করলেও ক্যাম্পে এসে তারা ভাসানচর বিষয়ে কোনো প্রচারণা চালায়নি। বিদেশীদের অর্থে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হলেও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঠেকানো যায় কিনা, দেখতে পুরনো রোহিঙ্গা নেতারা তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

পাঠকের মতামত

কোর্টবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, বেকারি ও মাংসের দোকানকে জরিমানা

 কক্সবাজারের কোর্টবাজারের ভালুকিয়া রোডে মধ্যরত্না রত্নাংকুর বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন একটি বাসায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি ...

রোহিঙ্গাদের দক্ষতা উন্নয়নে ৪৬ কোটি টাকায় পরামর্শক নিয়োগের অনুমোদন

চট্টগ্রাম বিভাগে আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ...

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুসন্ধানে উঠে ...
Single Page Footer