প্রকাশিত: ০৯/০৩/২০২১ ১২:১৬ পিএম

l
দেশের প্রথম রূপান্তরিত নারী সংবাদ পাঠক তাসনুভা আনান শিশির ঢাকা ট্রিবিউনকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ পর্যায়ে আসতে তার বহু বছরের যন্ত্রণা ও নিপীড়নের দিনগুলোর কথা জানান

বিশ্ব যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করছে তখন বৈশাখী টেলিভিশনে দেশের প্রথম রূপান্তরিত নারী সংবাদ পাঠক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন তাসনুভা আনান শিশির।

নিজের স্বাধীন হওয়ার পেছনের গল্প জানতে চাইলে ঢাকা ট্রিবিউনকে তাসনুভা বলেন, এ যাত্রা বহু বছরের যন্ত্রণা ও নিপীড়নের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।

“আমার আজকের এ সাফল্য রাতারাতি আসেনি। এই স্থানে পৌঁছাতে বহু বছর ধরে অনেক ভোগান্তি ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে,” বলছিলেন তিনি।

সংবাদ পাঠক হওয়ার যাত্রার কথা স্মরণ করে তাসনুভা বলেন, “এই সুযোগটি পেতে আমাকে একজন সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে।”

তিনি জানান সাধারণ ছেলে বা মেয়েদের মতো কোনও সুবিধা না পাওয়ায় তাকে তার সক্ষমতা প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করতে হয়েছে।

প্রখ্যাত পরিচালক চয়নিকা চৌধুরীর মাধ্যমে বৈশাখী টিভি’র সাথে পরিচয় হয় তাসনুভার।

কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে চেষ্টা করেও, তবে কেউ তাকে সুযোগ দেয়নি জানিয়ে তাসনুভা বলেন, “আমি যখন বৈশাখী টিভিতে যাই, তারা আমাকে অডিশন দিতে বলে। আমি কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করেই সুযোগটি নিয়ে নিই।”

অডিশনের সময় কিছু ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও, তাকে একটি সুযোগ দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাসনুভা নিউজরুমের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তাসনুভা বলেন, “আমি সব সময় একটি বড় সুযোগ খুঁজেছি যা মানুষের চিন্তায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করবে।”

ফেলে আসা জীবন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তাসনুভা জানান, বহু বছর ধরে কণ্ঠস্বর এবং শারীরিক গঠনের জন্য কারণে তাকে অপমান ও হয়রানি করা হয়েছিল। কারণ তিনি কামাল হোসেন শিশির নামে একজন পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

তিনি বলেন, “যখনই আমি বাসা থেকে বের হতাম, আমাকে অপমান করা হত। স্কুলে যাওয়া ছিল আরেক লড়াই। কোন বেঞ্চে বসবো? ছেলেদের নাকি মেয়েদের? ”

“যখন আমি স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষে ছিলাম তখন আমার হরমোন বিকাশ শুরু হয়েছিল। আমার চুল লম্বা হয়ে উঠছিল। তাই আমি ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিই। আমার বিভাগের একজন শিক্ষক পুরো ক্লাসের সামনে আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলেছিলেন।”

চারিদিক থেকে অনেক অপ্রীতিকর মন্তব্য পেয়েও তাসনুভা নিজেকে খুব ভাগ্যবান এবং সুযোগ্য বলে মনে করেন। কারণ তার বাবা-মা সর্বদা তার সঙ্গে ছিলেন।

তবে, তার রূপান্তরিত হওয়ার পরে, কেউ তাকে সহজে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। এমনকি অনেকে তার সাথে সম্পর্কও ছিন্ন করে দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে মডেলিংয়ের সাথে জড়িত তাসনুভা ২০০৭ সালে অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন নাট্যদল “নাটুয়া” দিয়ে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নাট্যদল “বটতলা”র সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি।

“থিয়েটার আমায় নিজেকে আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছে। তাসনুভাকে অন্বেষণে সহায়তা করেছে। আমার থিয়েটার আমার বটতলা,” তিনি বলছিলেন।

বলেন খুব অল্প বয়সেই, বড় বোন তাকে নাচের স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন, কিন্তু তাসনুভাকে নাচতে মানা করে দেওয়া হয়।

নাচের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তার বড় বোনকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বলেন, “যখন আমার পরিবার নাচ শেখা বন্ধ করে দেয়, তখনই আমি কী করতে চাই এবং আমি কী হতে চাই সে বিষয়ে মনস্থির করে ফেলি। এই জীবন আমার আর আমি এই পথে চলবো।”

সম্প্রতি, তিনি দু’টি চলচ্চিত্রের জন্যও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। পর্দায় তাকে অনন্য মামুনের চলচ্চিত্র “কসাই”-এ গোয়েন্দা চরিত্রে এবং সৈয়দ শাহরিয়ারের চলচ্চিত্র “গোল”-এ একজন নারী ফুটবল কোচ হিসাবে অভিনয় করতে দেখা যাবে।

“আমি বলছি না যে আমার সম্পর্কে গণমাধ্যমে রিপোর্ট থাকতে হবে। তবে কথা হচ্ছে আমাদের সম্প্রদায়ের প্রত্যেকেই যুগে যুগে হতাশার সাথে জীবন কাটিয়েছেন। তাই, জনগণের জন্য আমার গল্পট জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নারীর লড়াই আলাদা, পুরুষের লড়াই আলাদা, কিন্তু তাদের কারও লড়াই আমার মতো নয়।” সুতরাং, এই বিষয়টি স্বাভাবিক করার জন্য সবাইকে জানানো উচিত বলে তাসনুভা মনে করেন।

এ বছরের শুরুতে তাসনুভা তার স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) করার জন্য বৃত্তিও পেয়েছেন তিনি।

তিনি বিশ্বাস করেন, এমন একদিন আসবে যখন রূপান্তরিত নারী সংবাদ পাঠক দেখে কেউ আর অবাক হবে না। তিনি রূপান্তরিত প্রত্যেক মানুষকে স্বাধীন হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে চান।

“সরকারের উচিত তাদের সম্প্রদায়কে যথাযথ সমর্থন ও সুযোগ নিশ্চিত করা,” বলেন তাসনুভা।

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত: সেনাপ্রধান

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ...

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বারোটা বাজিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই আগের সরকার প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে ...

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াটাও কঠিন হয়ে যাবে একদিন: বিদ্যুৎমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ...

রোহিঙ্গাদের জন্য আরও সুইডিশ সহায়তা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাংলাদেশে আরও বেশি সুইডিশ সহায়তা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ...
Single Page Footer