রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে কার লাভ

তন্ময় চৌধুরী ::
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। আর এ হত্যাকাণ্ডের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এড়াতে পারে না। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো যে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করছে, তা শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলসহ অপরাধপ্রবণতা কমাতে যখনই বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে; তখনই আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে শোরগোল পাকিয়ে তোলে। শরণার্থী ব্যবস্থাপনার অজুহাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত করে সুবিধা গ্রহণ করছে কিছু স্বার্থান্বেষী আন্তর্জাতিক সংগঠন; আর জীবন হারাচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে থাকা হতাশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের অনেকেই।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। সব মিলে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশের উদারতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের অনুদানের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং তা খুবই প্রশংসনীয়।

কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের মূলে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মনোযোগ না দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ‘রোহিঙ্গা আত্তীকরণ’ ও এর বিনিময়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রাপ্তির সুবিধা ইত্যাদি দৃশ্যপট তৈরি করা হচ্ছে, যা সন্দেহজনক। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মসংস্থান করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো অজুহাত দেখালেও প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয়দের ওপর। এক গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয় মজুরির হার প্রায় ১৪ শতাংশ কমে গেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অথচ একজন স্থানীয় বা রোহিঙ্গা শ্রমিকের দৈনিক মজুরির সমান টাকা কক্সবাজারের হোটেলে এক কাপ কফি খেতেই খরচ করছে একেকজন আন্তর্জাতিক এনজিও কর্মকর্তা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেয়ে নিজেদের বিলাসবহুল জীবনযাপন, উচ্চ বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা-এ সবকিছুই আজ তাদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠছে।

কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বাংলাদেশ ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করলে তখনও দেখা গিয়েছিল কিছু আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনের নেতিবাচক তৎপরতা। ২০২১ সালের ১৭ জুন একটি মানবাধিকার সংগঠন তাদের ফেসবুকে ‘রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে আওয়াজ তুলো’ নামক স্বাক্ষর কর্মসূচি প্রকাশ করে। অথচ এসব সংগঠন রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হিসাবে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন’বিষয়ক কোনো উদ্যোগ বা কর্মসূচি না নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের মতো মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছে।

কিছু সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা গ্রুপের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে কিছু আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনের বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত করতে, এমনকি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে ২০১৭ সালের আগে ও পরে আসা কিছু সন্ত্রাসী রোহিঙ্গার সঙ্গে অনেক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে বলেও শোনা যায়। আর মুহিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ডটি সেই ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়।

তাছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। তৎকালীন মিয়ানমার সরকারের ‘ধীরগতি নীতি’ এবং কিছু আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনের ষড়যন্ত্রের কারণেই সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার যে অভিযোগ ছিল, তার সত্যতা রয়েছে বলে এখন মনে হচ্ছে। ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই ভেরিফিকেশনের জন্য প্রায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ।

সেসময় মাত্র ৩,৪৫০ জন রোহিঙ্গার ছাড়পত্র প্রদান করে মিয়ানমার সরকার। এ রকম ধীরগতি নীতির পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারের অনিচ্ছার কারণে একজন রোহিঙ্গাকেও এযাবৎ ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। তাছাড়া রোহিঙ্গারা সে সময় তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণসহ বেশকিছু দাবি তোলে, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব হওয়ার আরেকটি কারণ। নিজেদের আর্থিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে কিছু আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংগঠন এসব দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে এখনো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত করে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (জেআরপি) নামের কমিটি ২০১৭ সাল থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও তা পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান এ কমিটির সদস্য। বর্তমানে ২১টি আইএনজিওসহ ১২৩টি বেসরকারি সংগঠন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাজ করছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তার জন্য ২০১৭ সালে ৩১৭ মিলিয়ন, ২০১৮ সালে ৬৫৫ মিলিয়ন, ২০১৯ সালে ৬৯৯ মিলিয়ন এবং ২০২০ সালে ৬২৯ মিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হলেও এর অধিকাংশই আইএনজিও নির্বাহীদের বিলাসবহুল জীবনধারা বজায় রাখার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে বলে দাবি করে ‘কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম’ নামের একটি পর্যবেক্ষক সংগঠন। ‘কোস্টাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন ট্রাস্ট’ (কোস্ট) নামের এক সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার (আইএনজিও) পরিচালন ব্যয় ‘রোহিঙ্গা সহায়তা চাহিদা’র চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। তাদের কেস স্টাডি অনুযায়ী, কোনো একটি নির্দিষ্ট আইএনজিও তাদের প্রোগ্রামের জন্য ১৮ শতাংশ এবং অপারেশনের জন্য ৮২ শতাংশ ব্যয় করেছে। আইএনজিও’র পরিচালন ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় সংগঠনগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনগুলো শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকারের বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিশ্বে শরণার্থীর উদ্ভব হলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর কাছে চাকরি, বেতনভাতা, ব্যবসা প্রাধান্য পেয়ে থাকে এবং তারা বাস্তবতাবিবর্জিত বিভিন্ন দাবি তোলার কারণে অনেক সময় সমস্যা দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। ফলে এখন রোহিঙ্গাদের অবস্থাও যে ৭০ দশক যাবৎ রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিনিদের মতো হবে না এবং এশিয়া অঞ্চলে আরেকটি ফিলিস্তিন সংকট তৈরি হবে না; সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই হয়তো গত ৪ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শরণার্থীদের লালনপালন করাটাই অনেক বিদেশি সংস্থার জন্য ব্যবসা। রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি মিয়ানমারে, সমাধানও রয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইন রাজ্যে তাদের মাতৃভূমিতে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই কেবল এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে। আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোরও উচিত স্থায়ী সমাধানের দিকে বেশি দৃষ্টিপাত করা।

তন্ময় চৌধুরী : অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন