
নেত্রকোণার কলমাকান্দায় জাল কাগজপত্র ও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে দুই রোহিঙ্গার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুলসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় নির্বাচন অফিসের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও চাকরিচ্যুত এক কম্পিউটার অপারেটরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গতকাল (১০ অক্টোবর) রাতে দায়ের করা মামলায় পরদিন শুক্রবার ভোরে মো. মঞ্জুরুল মিয়া ও কাঞ্চন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দুপুরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা শুক্রবার বিকেলে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, দুই রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরির ঘটনায় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আরিফ মিয়া, স্ক্যানিং অপারেটর স্মরণ সরকার হীরা এবং রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী ও মোকসেদ আলী। এজাহারে তাঁদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি এবং দুই রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও এনআইডি পেতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তে উঠে আসে জালিয়াতির তথ্য
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২ মার্চ কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন জিল্লুর রহমান। এর আগে কামরুল হাসান নামের এক ব্যক্তির ভোটার নিবন্ধন নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে গত ২৯ মার্চ ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তদন্তের নোটিশ দেওয়া হয়। ৩১ মার্চ তদন্ত শুরু হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তদন্তের ভিত্তিতে গত ২০ জুলাই জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে এক রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাঞ্চন মিয়া ও আরিফ মিয়া এবং স্ক্যানিং অপারেটর স্মরণ সরকার হীরাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই কয়েকজনের ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন সার্ভারে তথ্য আপলোডের কাজ করা হয়।
পরে ভোটার তালিকার তথ্য যাচাই করতে গিয়ে অসংগতি ধরা পড়ে। সরেজমিন যাচাইয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভোটার হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী।
সিসিটিভি ফুটেজেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
সর্বশেষ নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এনআইডি তৈরির ঘটনায় নির্বাচন অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৯ জুলাই নির্বাচন অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট হওয়ার ঘটনায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাদী।
তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে আদালতে দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
যেভাবে সামনে আসে দুই রোহিঙ্গার এনআইডির বিষয়টি গত বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়, কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের বাসিন্দা পরিচয়ে নূর হালিমা (২৫) ও মুজিবুর রহমান নামে দুই রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে নূর হালিমার এনআইডি গত ১১ আগস্ট হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে মুজিবুর রহমানের এনআইডির তথ্য নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপলোড করা হলেও বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাঁকে কার্ডটি হস্তান্তর করা হয়নি।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে শান্তিনগর গ্রামে গেলে ওমর আলী জানান, নূর হালিমা নামে তাঁর কোনো মেয়ে নেই। এরপর বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। এর পরদিনই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা থানায় মামলা করেন।
এ বিষয়ে রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইটে ওই দুই ব্যক্তির তথ্য নেই। বাইরে থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁরা জন্মনিবন্ধন করিয়ে নিয়েছেন

পাঠকের মতামত