
কক্সবাজারের রামু সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, জেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবী, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একাধিক গ্রন্থ প্রণেতা প্রফেসর মোশতাক আহমেদ প্রকাশ মোশতাক স্যার আর নেই।
মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) দিনগত রাত ১১টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
বিষয়টি নিশ্চিত করে তার ছেলে শামীম আহসান ভুলু বাংলানিউজকে জানান, রাতেই তার মরদেহ রামু উপজেলার হাইটুপি গ্রামের নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হচ্ছে।
আগামী বুধবার (২ ডিসেম্বর) নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে। তাৎক্ষণিক তার জানাজার সময় জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে প্রবীণ এই শিক্ষবিদের মৃত্যুতে জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রফেসর মোশতাক আহমদ ১৯৪০ সালের ৮ জানুয়ারি রামু উপজেলার মণ্ডলপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তার বাবা রশিদ আহমদ ছিলেন তৎকালীন সমবায় কর্মকর্তা ও মা মুনিরা বেগম ছিলেন গৃহিনী। তিনি ১৯৫৫ সালে রামু খিজারী হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে বিএ অনার্স, ১৯৬৩ সালে ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন।
এরপরই সাতকানিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবনের সূচনা করেন। ১৯৬৩ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন ও প্রতিষ্ঠাতা প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে পিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে নির্বাচিত ও ঢাকা সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, সিলেট এমসি কলেজ, চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৭ সালে কমিশন অফিসার (শিক্ষা) হিসেবে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন। মতদ্বৈততার কারণে চাকরি ত্যাগ করে ১৯৬৯ সালে তিনি সিলেট সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য সরকারি চাকরি ছাড়েন। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামের হুলাইন সালেহ নুর কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত রামু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রামু খিজারী উচ্চ বিদ্যালয় ও রামু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষানুরাগী সদস্য ছিলেন। এক যুগেরও বেশি খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্ব দেন। কক্সবাজারের পতন হলে পার্শ্ববর্তী বার্মায় (মিয়ানমার) আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখান থেকেও শত্রু সেনাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। স্বাধীনতার পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ-মোজাফফর) যোগদান করেন এবং ওই সময় কক্সবাজার তিনি জেলা সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে রামু-উখিয়া-টেকনাফ এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৭৫ সালে পার্টির পক্ষ থেকে মস্কো ভ্রমণ করেন এবং সেখানে মার্কস-লেলিনের রাজনৈতিক দর্শনের উপর ছয় মাস গবেষণা করেন। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে মস্কো থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।
প্রফেসর মোশতাক আহমদ শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে কক্সবাজার জেলা শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ, ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান, ২০০৩ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে কৃতি শিক্ষাবিদ পুরস্কার এবং সাহিত্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন।
তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। শিক্ষা ও সাহিত্যে বিরল প্রতিভাধর এ ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল শূন্যতা।
জেলার এ বরেণ্য শিক্ষাবিদের মৃত্যুর খবরে মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যুর খবর পেয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ও রামুর হাইটুপী গ্রামের নিজ বাড়িতে ছুটে যান তার অসংখ্য ভক্ত ও ছাত্রছাত্রী।

পাঠকের মতামত