
সুজাউদ্দিন রুবেল :;
রাত ৯টা, সৈকতের লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চের সামনে হাজির এক দম্পতি। তাদের হাতে ছিল পেপার চায়ের কাপ। তারপর দুজনই বসে পড়লেন ফাঁকা সৈকতে বালিয়াড়িতে ফেলে রাখা কিটকটে (ছাতা)। এরপর কিটকটে বসে একটু চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর গল্প করছেন দু’জনে আপনে মনে। মিনিটে দশেক হল; তখন চাও শেষ হয়ে গেল। শেষ হল তাদের গল্পও। এরপর পেপারের চায়ের কাপ দুটি কিটকটে রেখে বসা থেকে উঠলেন তারা।
তারপর একে অপরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে চলা; মাঝে মধ্যে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেউ আসছে কিনা তা দেখছেন। তবে কাউকে দেখতে না পেয়ে হাঁটার গতি একটু বাড়ালেন দু’জনই। ৫ মিনিট হেঁটে শুকনো বালিয়াড়ি পাড়ি দিয়ে পৌছালেন বিশাল সাগরের ঢেউয়ের সামনে। দুজনই মিনিট পাঁচ’য়েক সাগরের আঁছড়ে পড়া ঢেউ আর গর্জন শোনলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটু পা বাড়িয়ে নোনাজলে পা ও হাত ভেজানোর জন্য যাচ্ছিল দু’জনই।
তখন লাইট হাতে পৌছে গেলেন দু’জন ট্যুরিস্ট পুলিশ। পুলিশের ডাক শোনে দু’জনের আর নোনাজলে পা ও হাত ভেজানো হল না। তারপর ট্যুরিস্ট পুলিশ দু’জনকে মিনিট দুয়েক শোনালেন
লকডাউনে সাগরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথা। এরপর আর এই দম্পতি কিছু না বলেই চুপচাপ সাগরের তীর থেকে উঠে আসতে বাধ্য হলেন।
এরপর বিচ মার্কেট দিয়ে চলে যাবার সময় কথা হয় দু’জনের সাথে। তবে নাম প্রকাশ না করা স্বত্ত্বে এই দম্পতি বলেন, চাকরির সুবাদে দুজনই কক্সবাজারের অবস্থান করছেন প্রায় ২ বছরের কাছাকাছি। লকডাউনে দুজনই অস্থির হয়ে উঠায় একটু সাগর তীরে ছুটে আসা। লকডাউনের কারণে সৈকত ফাঁকা দেখে নোনাজল ছুঁতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আর সে নোনাজল স্পর্শ করা হল না। ট্যুরিস্ট পুলিশ এসে দুজনকেই চলে যাবার জন্য বলল আর কিছু নির্দেশনার কথা বলল। তাই বাধ্য হয়ে আবার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।
শুধু এই দম্পতিই নন; রাত নামলেই সৈকতের লাবণী, সীগাল, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ছুটে আসে অনেক দম্পতি এবং তরুণরা। কিন্তু লকডাউনের সৈকতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রতিটি পয়েন্টে কড়া পাহারায় রয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। লুকোচুরি করে কেউ নামলেও পরে দেখতে পেয়ে তাদেরকে সৈকতে থেকে তুলে দেন ট্যুরিস্ট পুলিশ।
রাত ১০টা; লাবণী পয়েন্ট দিয়ে সাগর তীরে নামতে চাইলেন গণস্বাস্থ্য কক্সবাজার কার্যালয়ে চাকরিরত আরেক দম্পতি। তারাও নাম বলতে চাইলেন না। তারা বলেন; ইফতার করার পর ভাল লাগছিল না। তাই দুজনে সাগর তীরে এসে একটু বসার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলাম। প্রথমে লাবণী পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করতে চেয়ে প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করেছি; কেউ বাঁধা দেয় কিনা সেটা দেখার জন্য। কিন্তু কেউ বাঁধা না দেয়াতে সাহস নিয়ে বালিয়াড়ি পাড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু একটু যেতে না যেতেই ছুটে এল ট্যুরিস্ট পুলিশ।
অবশেষে বলল; লকডাউনে সৈকতে নামা নিষেধ। আপনারা তাড়াতাড়ি চলে যান। পরে অনুমতি নিয়ে দূর থেকে কিছুক্ষণ সাগরের ঢেউয়ের গর্জন শুণে ফিরে যাচ্ছি। করার কিছুই নেই। ট্যুরিস্ট পুলিশের নির্দেশনা মানতে বাধ্য।
করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পহেলা এপ্রিল থেকে হোটেল-মোটেলসহ কক্সবাজারের সকল পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
এরপর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সৈকত এলাকার সকল দোকানপাট। সৈকতে প্রবেশ কঠোর অবস্থানে যায় ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটকসহ স্থানীয় দর্শনার্থী কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না সৈকতে। সেটা দিন হোক বা রাত হোক। প্রতিটি পয়েন্টে বসানো হয়েছে পুলিশি পাহারা আর বালিয়াড়িতেও টহল দিচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
এব্যাপারে রোববার (২৫ এপ্রিল) রাতে দায়িত্ব থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ বিল্লাহ হোসেন বলেন; করোনার সংক্রমণ বাড়ায় লকডাউন চলছে, তার উপর সৈকতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই দিনে কিংবা রাতে সৈকতে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। যতদিনই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে, ততদিনই সৈকতে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, “সন্ধ্যার পর সৈকতে অনেকে আসে। তারা সাগরের গর্জন শোনার পাশাপাশি নোনাজল ছুঁতে চাওয়ার অনুমতি চায়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে কাউকে সৈকতে প্রবেশ করতে দিতে পারি না। আবার অনেকেই লুকোচুরি করে সৈকতে নেমে যান।
পরে দেখতে পেলে তাদের কেউ তুলে দিতে বাধ্য হয়। এতে অনেকের সাথে বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়তে হয়। আবার অনেকেই মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু করার কিছুই নেই। যতদিন সৈকতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা না উঠে, ততদিন সৈকতে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।”

পাঠকের মতামত