প্রকাশিত: ০২/০৩/২০২২ ২:২৮ পিএম

মনতোষ বেদজ্ঞ ::
টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপের একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি খোলা হয় সকাল ১০ টার পর। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসেন ইচ্ছেমতো। হাসপাতালে অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনও করেন ইচ্ছেমতো। অবকাঠামোগত উন্নয়ণ হলেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় লোকবল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরী অবস্থায় চিকিৎসা পাওয়া দু:সাধ্য এই হাসপাতালে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে হাসপাতালের মূল ফটক খোলা থাকলেও ভেতরে জরুরি বিভাগ এবং হাসপাতালের মূল ভবনের প্রবেশ পথে তখনও তালা ঝুলছে। অভ্যর্থনা কক্ষে কেউ নেই। কক্ষের ভেতরে জমেছে ধুলোবালি। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারি কারও দেখা নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এই হাসপাতাল খোলা হয়না না বলে সকাল ১০ টার আগে কোন রোগীও আসেন না। এখানকার চিকিৎসা সেবা নিয়ে নিরাশার কথা জানালেন স্থানীয় অনেকেই।

হাসপাতাল প্রাঙ্গনে অপেক্ষার কিছুক্ষণ পর দেখা মিললো রমজান আলী নামে একজনের। তিনি হাসপাতালের এমএলএসএস। পরিচয় পেয়েই সাংবাদিক আসার খবর তিনি মুঠোফোনে জানিয়ে দিলেন অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এরপর খোলা হলো প্রবেশ পথের তালা। ফোন পেয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক সহকারী সার্জন জোবাইদা আক্তার এলেন। পরে এলেন মিডওয়াইফরাও। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
এমএলএসএস রমজান আলী স্বীকার করলেন সকাল ১০টার আগে কখনো হাসপাতাল খোলা হয়না। এ হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। পরিচ্ছন্নতা কর্মী নেই। আছে বিদ্যুৎ সমস্যা এবং সুপেয় পানির সংকট।
দ্বীপের পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ আহমদ বলেন, এই হাসপাতালের প্রসব সেবা নিয়ে ভরসা করা যায়না। ঘরে প্রসূতি থাকলে পুরো পরিবার দুঃশ্চিন্তায় থাকে। তাছাড়া কিছুদিন আগে বিষপান করা এক কিশোরকে বাঁচানো যায়নি। এখানে চিকিৎসা না পাওয়ায় তাকে স্পীডবোট ভাড়া করে প্রথমে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে সে মারা যায়।

# কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসেন ইচ্ছেমতো # চিকিৎসা সরঞ্জাম ও লোকবল সংকট # দ্বীপে সী-এ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি

স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, হাসপাতালে সময়মতো ডাক্তার থাকে না, নার্স থাকে না। কিছু সাধারণ ওষুধ ছাড়া অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। বড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বাদ দিয়ে এক্সরে করারও ব্যবস্থা নেই। পর্যটন মৌসুমে তবুও কিছুটা সেবা পাওয়া। বাকি সময়টাতে হাসপাতালে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গনে আলাপকালে গোলজার বেগম নামে স্থানীয় এক নারী বলেন, বিগত সময়ের তুলনায় স¤প্রতি কিছুটা হলেও সেবা মিলছে। গত বছর আমার এক মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি প্রসব জটিলতার কারণে। টেকনাফ নেওয়ার পথে আমার কোলেই সে মারা যায়। এখানে চিকিৎসা ভালো থাকলে মেয়েটাকে হয়তো বাঁচাতে পারতাম।
জরুরি অবস্থায় রোগীদের সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফ বা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্তত একটি সী-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ সৈয়দ আলম। তিনি বলেন, হাসপাতালে শুধু চিকিৎসক থাকলে হবে না, যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। যন্ত্রপাতিগুলো চালু রাখা প্রয়োজন। আল্ট্রাসনোগ্রাফি চালু করাসহ প্রসূতি সেবার মান বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে এখানে যাতে সিজার অপারেশন করা সম্ভব হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানাই।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ১০ শয্যার এ হাসপাতালটি স¤প্রতি উন্নীত হয়েছে ২০ শয্যায়। এখানে চিকিৎসক কর্মরত আছেন চার জন। তাদের মধ্যে দুইজন সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। অপর দুইজন এনজিও থেকে নিয়োগ পাওয়া। মেডিকেল এসিসটেন্ট আছেন দুই জন। মিডওয়াইফ আছে চারজন। কোন নার্স নেই। পরিচ্ছন্নতা কর্মীও নেই। এখান থেকে কোন রোগীকে রেফার করা হলে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ বা কক্সবাজারে নিয়ে যেতে হয়।
হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সহকারী সার্জন জোবাইদা আক্তার প্রথমে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে তিনি হাসপাতালের বিষয়ে শুধুমাত্র ‘ইতিবাচক কথা’ বলতে রাজি হন।
জোবাইদা আক্তার বলেন, আমরা এখানে মূলত জরুরি সেবা এবং আউটডোর (বহির্বিভাগ) সেবাগুলোই দিয়ে থাকি। আমাদের ইনডোর (আন্তঃবিভাগ) সার্ভিস এখনও পরিপূর্ণভাবে চালু করা যায়নি। তারপরও জরুরি ক্ষেত্রে যদি প্রয়োজন হয় আমরা কিছু সময় রেখে যতটুকু করা যায় তা করি, অভজার্ভ করে বাসায় পাঠাই বা রেফার করে দিই।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে প্রসূতি সেবা চালু আছে। প্রতিমাসে এখানে ৭/৮ টি ডেলিভারি হয়। তবে এখানকার মানুষ প্রসব সেবা সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন নয়। বাড়িতেই তারা ডেলিভারি করাতে অভ্যস্ত।
বর্তমানের দ্বীপের বাসিন্দা ১০ হাজারের বেশি।
বিপুল পর্যটক উপস্থিতির কারনে দিন দিন গুরুত্ব বাড়ছে দ্বীপের একমাত্র হাসপাতালটির। পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি করা জরুরী বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

পাঠকের মতামত

অক্টোবরের মধ্যে চালু হবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: বিমানমন্ত্রী

অক্টোবরে মধ্যে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম ...

২৬-২৮ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবে মার্কিন প্রতিনিধিদল

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে আসছে মার্কিন কংগ্রেসের কর্মকর্তা পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। আগামী ২৬-২৮ আগস্ট ...
Single Page Footer