প্রকাশিত: ০৯/০৫/২০১৯ ৩:৫০ পিএম , আপডেট: ০৯/০৫/২০১৯ ৫:৫৩ পিএম

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ। এত সংখ্যক শরণার্থী বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক বিরাট বোঝা। আর এই বোঝার চাপ আরও বাড়াচ্ছে প্রতিদিন জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশু।

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এত বড় এই জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও বাংলাদেশের ভূমিতে স্থায়ী বসবাসে দিনের পর দিন জন্ম দিচ্ছে নতুন শিশু। প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শিশুর জন্ম হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরে। গত ২০ মাসে নতুন করে আসা রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে ২০ হাজারের ও বেশি রোহিঙ্গা নারী সন্তানসম্ভবা। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী এক বছরে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়াবে।

ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ নারী। এদের মধ্যে ১৩ শতাংশ কিশোরী এবং ২১ শতাংশ গর্ভবতী ও প্রসূতি। শিশুদের মধ্যে ৬-১৮ বছর বয়সী শিশুর হার ২৩ শতাংশ, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর হার ২১ শতাংশ এবং ১ বছরের কম বয়সের শিশুর হার ৭ শতাংশ।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন অন্তত ৬০ শিশু জন্ম নিচ্ছে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেইগবেডার এই তথ্য জানান।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী তিন মাসে মিয়ানমারে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেয় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী গর্ভবতী অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে ১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে আরও অন্তত চার লাখ রোহিঙ্গা। নতুন করে অনুপ্রবেশের পর গত ২০ মাসে এখানে জন্ম নিয়েছে আরও প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শিশু। জানা গেছে, ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ শিশু।

এত সংখ্যক শিশুর জন্ম দেশের উপর বড় ধরনের একটি চাপের প্রভাব। ভবিষ্যতে এই চাপ ভয়াবহ আকারও ধারণ করতে পারে। এরপরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও এই নিয়ে দেশটি নীরব ভূমিকাই পালন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের উপরই নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠাতে চায় বাংলাদেশ।

কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে অন্যথায় বাংলাদেশে জন্ম নেয়া এত সংখ্যক শিশু কিশোরদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।

তারা বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নিবন্ধনভুক্ত চার লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে আরও এক লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে যে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসেছে এদের মধ্যেও ২ লাখ ৪০ হাজার শিশু-কিশোর রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর এক যুগ্ম সচিব বলেছেন, রোহিঙ্গাদের শিশু জন্ম দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছে কিছু সংখ্যক এনজিও। তারা রোহিঙ্গা শিশুদের এবং মায়েদের জন্য সামান্য পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করছে।

নিজস্ব লাভের আশায় এ ধরনের উৎসাহ দিচ্ছে এনজিওগুলো। তারা মনে করছে, সন্তান হলেই তার জন্য আলাদা ভরণপোষণ পাওয়া যাবে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তারা সেটি মানছে না।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। এখন যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে, সেভাবে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও নিবন্ধন করা হবে কি না সে বিষয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি বলেন, বাবা-মা রোহিঙ্গা হওয়ায় এ দেশে জন্ম নেওয়া তাদের শিশুরাও স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। তারা এ দেশে জন্ম নেওয়ার সুবাদে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি একটু অন্যরকম। তারা এখানে অস্থায়ীভাবে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আটকেপড়া বিহারিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আগপর্যন্ত তাদের বিহারি হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই, এই শিশুরা রোহিঙ্গা হিসেবেই তালিকাভুক্ত হবে।’

আসিফ মুনীর বলেন, ‘যদি কোনো কারণে তাদের এই দেশে থেকে যেতেই হয়, তাহলে সেটা অনেক পরের বিষয়। এছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে যদি কখনো এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তাহলে এসব শিশুর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা গুরুত্ব দিতে হবে। আবার যেসব শিশু বাবা-মা ছাড়া আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এসেছে, তাদের কে গ্রহণ করবে, এসব বিষয়ও আলোচনায় থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত মনে হয়, এই শিশুদের রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবেই দেখা হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব শিশু বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে, তাদের তালিকা তৈরি করা উচিত। নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেই তালিকা যেন বাংলাদেশের কাছে থাকে। এসব শিশুর জন্ম তারিখ, ব্লাড গ্রুপ চেক করে রাখাসহ প্রয়োজনে তথ্য থাকা উচিত।’

রোহিঙ্গা শিশুরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবে কি না জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের নাগরিকত্বের বিষয়ে এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি সরকারের পলিসির ওপর নির্ভর করছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান বলেন, তাদের এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনো সুযোগ এখনো নেই। তবে এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের পলিসির ওপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা না করলে আমাদের নাগরিক জীবনে ভয়াবহ চাপ পড়বে।

উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন বলেন, একটি ক্রাইটেরিয়া ছিল জন্ম নিবন্ধনের সার্টিফিকেটে একটি সিল থাকবে, সেখানে লেখা থাকবে তারা মিয়ানমারের নাগরিক। ওই জন্ম নিবন্ধনের কাজটাও চলছিল শুধু নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের জন্য। কিন্তু এই নিবন্ধিতদের বাইরেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ছিল, যাদের বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এবার এই রোহিঙ্গা আসার পর থেকে কক্সবাজারের পুরো জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাই বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছি আগে। এরপর সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই কাজ হবে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো ইনস্ট্রাকশন নেই।

এদিকে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উদ্বিগ্ন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের ওপর জরিপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় এনজিওদের কার্যক্রমের ওপরও নজর রাখতে বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাই থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অধিক জন্মহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত এদের ভাসানচরে প্রত্যাবাসনের সমর্থন আদায় করতে হবে।

কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে, তখন প্রথম তিন মাসে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৮০ জন গর্ভবতী নারীর। তার মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হয় সাড়ে পাঁচ হাজার শিশু আর বাকিগুলো হোম ডেলিভারি হয়।

২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ২০ মাস রোহিঙ্গা নারীদের গর্ভধারণ হার আগের মতোই ছিল। সে হিসেবে রোহিঙ্গা নবজাতকের সংখ্যা এক লাখের কম নয়। গত কয়েক মাস আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করার পর অনেক সচেতন হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। আমরা এ পর্যন্ত ৬৮ হাজার নারীকে ইনজেকশন দিয়েছি, ৬৫ হাজার নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ দিয়েছি। এছাড়া তিন বছর মেয়াদি ও ১০ বছর মেয়াদি ইনজেকশন দিয়েছি আরও প্রায় ছয় হাজার জনকে।

পাঠকের মতামত

জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে সুযোগ পেলেন কক্সবাজারের ইয়াশনা

​চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী ইয়াশনা ইকতার জাপানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ...

বিলাসবহুল গাড়ি, তরুণ সিন্ডিকেট ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে বিস্তৃত ইয়াবা নেটওয়ার্ক

কখনো বিলাসবহুল প্রাইভেটকার, কখনো সুন্দরী নারী, কখনো পেটের ভেতর, কখনো শরীরের বিভিন্ন অংশে, আবার কখনো ...

কোর্টবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, বেকারি ও মাংসের দোকানকে জরিমানা

 কক্সবাজারের কোর্টবাজারের ভালুকিয়া রোডে মধ্যরত্না রত্নাংকুর বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন একটি বাসায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি ...
Single Page Footer