প্রকাশিত: ১৮/০৭/২০১৯ ৭:৪৩ এএম , আপডেট: ১৮/০৭/২০১৯ ৭:৪৩ এএম

মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে রাঙামাটি থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন ডা. রেনিন সু। ২০১৫ সালে তাকে গ্রেফতারের সময় তার রাজস্থলীর বাড়ি থেকে আরাকান আর্মির পোশাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছিল। একই সময় ওই বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় অংঞ্চোওয়াং রাখাইন নামে আরাকান আর্মির সক্রিয় এক সদস্যকেও। পরবর্তীকালে তদন্তে উঠে আসে, চিকিৎসক পরিচয়ের আড়ালে আরাকান আর্মির প্রধান তুন মায়াত নাইং-এর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন ডা. রেনিন। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। এরপরও ওই বছরের জুনে আদালত থেকে জামিন পান তিনি। এরপর থেকে তার হদিস মেলেনি আর। গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, জামিন পাওয়ার পর সপরিবারে নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে গেছেন রেনিন। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি উত্তর নেদারল্যান্ডসের হেমস্টেড শহরে বসবাস করছেন।

চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে আমেরিকান একটি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক হিসেবে পেট্রোবাংলার সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশে আসেন মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের নাগরিক রেনিন সু। সিলেট, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই, কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার পর ১৯৯৮ সালে রাঙামাটির রাজস্থলীর তাইতংপাড়ার প্রভাবশালী অংসুই প্রু মার্মার মেয়ে হ্লাচিংনু মার্মাকে বিয়ে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘাঁটি গাড়েন তিনি। বর্তমানে রেনিন মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং নেদারল্যান্ডসের ত্রিদেশীয় নাগরিক! ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেও রয়ে যান রেনিন। রাজস্থলীতে রীন ফার্মেসি নামে দোকান খুলে চিকিৎসক হিসেবে স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেন তিনি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজস্থলীতে অবস্থান করে তিনি মূলত আরাকান আর্মিকে নানাভাবে সহায়তা করতে থাকেন। ২০০৯ সালে তাইতংপাড়ায় বহুতল বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সালে বাড়ি নির্মাণ শেষ হয়। সীমান্তে আহত আরাকান আর্মির সদস্যদের এই বাড়িতে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন রেনিন। তার বাড়িতে মিয়ানমারের এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত। গুরুতর আহতদের চিকিৎসার জন্য আদিবাসী পরিচয়ে পাঠানো হতো চট্টগ্রাম শহরে।

২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হন রেনিন। সেই সময় রাজস্থলী থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন অহিদ উল্ল্যাহ সরকার। বর্তমানে তিনি র‌্যাব ২-এ কর্মরত। রেনিনের বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছিলেন অহিদ। সে প্রসঙ্গে সমকালকে তিনি জানান, আসামি রেনিন আরাকান আর্মিপ্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন- এ-সংক্রান্ত বহু দালিলিক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন অহিদ। বিবাহসূত্রে রাজস্থলীতে ঘাঁটি গেড়ে তিনি আরাকান আর্মিকে সহযোগিতা এবং চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন। গুরুতর আহতদের তার বাড়ি থেকে চট্টগ্রামের বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো। রেনিনের বাড়ি থেকে এ-সংক্রান্ত নানা তথ্যপ্রমাণও পাওয়া গেছে। চার্জশিটে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, রেনিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি এখন রাঙামাটি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। এই আদালতেই রেনিনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। এ মামলার ১৫ সাক্ষীর মধ্যে ৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু জামিন পেয়ে পলাতক আসামি রেনিনকে এ মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

রেনিনের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া আরাকান আর্মির সদস্য অংঞ্চোওয়াং রাখাইন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে আরাকানের এই নাগরিক জানান, কয়েক বছর আগে আরাকান আর্মিতে যোগ দিয়ে বোয়াদাগং ক্যাম্পে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। ওই ক্যাম্পে তার মতো আরও ২০০ সৈনিক রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে টহল দিতে গিয়ে মাইন বিস্ম্ফোরণে হাত ও চোখে আঘাত পান তিনি। থোয়াই নাই মারমা নামে একজন তাকে চট্টগ্রামের রয়েল হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। চিকিৎসা শেষে তাকে রাজস্থলীতে ডা. রেনিন সুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মতো আরও অনেকেই ওই বাড়িতে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেছেন বলেও দাবি করেছেন আরাকান আর্মির এই সদস্য।

তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, মিয়ানমারে ছাত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে ডা. রেনিনের সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগাযোগ শুরু হয়। তিনি রাজস্থলীতে আসার পর আরাকান আর্মিপ্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। আরাকান আর্মির আহত সদস্যদের চিকিৎসাসেবা দিতেন তিনি। এর অংশ হিসেবে ২০০১ সালে স্কলারশিপ নিয়ে নেদারল্যান্ডসে গিয়ে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নোভা কলেজে নার্সিংয়ের ওপর বিশেষ ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন তিনি। এ সময় ওই দেশের নাগরিকত্ব নেন তিনি। এরপর থেকে তার নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশে আসা-যাওয়া চলতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও নেদারল্যান্ডসে নিয়ে সেখানকার নাগরিক করিয়ে নেন রেনিন। নেদারল্যান্ডসে থাকা অবস্থায় তিনি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক তার রাজস্থলীর বাড়ির ওপর নজর ও বাড়িতে অবস্থান নেওয়া সুস্থ ও অসুস্থ সৈনিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি ব্যাংকের রাজস্থলী শাখায় নিজের এবং স্ত্রীর নামে খোলা অ্যাকাউন্টে লেনদেন করতেন রেনিন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাপ্তাই উপজেলার দোভাষী বাজার শাখায়ও একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে তার। একই শাখায় মংপ্রুচিং মারমা নামের দুটি অ্যাকাউন্টেও লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। রেনিন সুর বাড়িতে অভিযানকালে এই পাঁচটি ব্যাংক হিসাবের চেক বইয়ের পাতা ও টাকা জমার রসিদ উদ্ধার করা হয়।

পাঠকের মতামত

‘ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মির্জা আব্বাস, দেশে ফিরতে লাগবে আরও কিছুটা সময়’

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের থেরাপি চিকিৎসা উন্নতির ...

প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় স্বামী, ক্ষোভে বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী

প্রথম স্ত্রীকে রেখে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় ছিলেন রফিউদ্দিন। এরই মধ্যে তার প্রথম স্ত্রী অন্য এক ...

কক্সবাজার লাইট হাউস দারুল উলুম মাদ্রাসা ও জামে মসজিদ দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

কক্সবাজার পৌরসভাধীন কলাতলি লাইট হাউজ এলাকাস্থ দারুল উলুম লাইট হাউস মাদ্রাসার পরিচালনা, মার্কেট ও মসজিদের ...

রামুতে সূর্যের হাসির চিকিৎসা ক্যাম্প উদ্বোধন করলেন এমপি লুৎফুর রহমান কাজল

কক্সবাজারের রামুতে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনা করেছে সূর্যের হাসি ক্লিনিক। ...
Single Page Footer