উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১/০২/২০২৪ ১১:৫৭ এএম , আপডেট: ২১/০২/২০২৪ ১১:৫৯ এএম

দেশের সীমান্তবর্তী ২১ জেলায় বড় অংকের নগদ অর্থ লেনদেন বাড়ছেই। গত অর্থবছরে এসব জেলার ব্যাংকগুলোয় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭ কোটি টাকা নগদ লেনদেন হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ জেলাগুলোয় নগদ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নগদ লেনদেন বেড়েছে ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। যেখানে সারা দেশে সামগ্রিকভাবে নগদ লেনদেন বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে দিনে ১০ লাখ টাকা বা এর বেশি নগদ জমা অথবা উত্তোলন হলে সেটিকে ক্যাশ ট্রানজেকশন (সিটিআর) বা নগদ লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্যাংকগুলোর এ ধরনের লেনদেনের তথ্য বিএফআইইউয়ে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটির সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অপরাধ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় টুল বা মাধ্যম হলো সিটিআর।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জামালপুর ছাড়া দেশের সীমান্তবর্তী সব জেলায় নগদ অর্থের লেনদেন বেড়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা, যশোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় এ ধরনের লেনদেন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ তালিকায় সীমান্তবর্তী অন্যান্য জেলার মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, শেরপুর, নওগাঁ, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা।

এসব জেলায় নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধকে দায়ী করছে বিএফআইইউ। এ বিষয়ে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ হলো বর্তমানে উদ্বেগের জায়গাগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সীমান্ত এলাকাগুলো এখন মাদক ও মানব পাচার, পণ্য ও অস্ত্র চোরাচালানের মতো অপরাধগুলোর উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ কারণে এসব এলাকায় অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকিও বেশি। সীমান্ত এলাকায় বড় অংকের নগদ লেনদেন এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল বিএফআইইউর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সংস্থাটির প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, ‘‌দেশের ব্যাংক খাত অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) প্রধান চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোয় ডিজিটাল লেনদেন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পাচারের সুযোগ নিচ্ছেন। দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয় তার কমপক্ষে ৮০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে সম্পন্ন হয়। এজন্য ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি), বিল পরিশোধ ও পণ্যের মূল্য যাচাইয়ে বাড়তি নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। ফলে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি ও রফতানির পরিমাণ কমে এসেছে। এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার কমে আসবে।’

মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘বিএফআইইউ তার কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এ বছরের প্রতিবেদনে আগের বছরের মতো বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি হুন্ডি, অবৈধ গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং ও ফরেক্স ট্রেডিং প্রতিরোধে বিএফআইইউর নেয়া কার্যক্রমের বিষয়ে পৃথক অধ্যায় সংযোজন এবং বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে।’

বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে দেশে নগদ লেনদেন বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নগদ লেনদেন হয়েছিল ২১ লাখ ১১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৯১৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। নগদ লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি গত অর্থবছরে দেশের আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদনও (এসএআর) ৬৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিএফআইইউতে এ ধরনের প্রতিবেদন জমা পড়েছে ১৪ হাজার ১০৬টি। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭৬৯টি ছিল এসটিআর। একই সময়ে ৪ হাজার ৩৩৭টি এসএআর জমা পড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দুই ধরনের প্রতিবেদন জমা পড়েছিল ৮ হাজার ৫৭১টি।

সন্দেহজনক লেনদেনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘‌এসটিআর ও এসএআরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের জন্য ইতিবাচক। আগে ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য দেয়ার বিষয়ে সচেতন ছিল না। বিএফআইইউর পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পরিপ্রেক্ষিতে রিপোর্টদাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সচেতনতা ও দক্ষতা বেড়েছে। এ কারণে এসটিআর ও এসএআরের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখছি। কোনো লেনদেনে অপরাধের উপাদান থাকলে সেগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ১৩৩টি আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ ধরনের প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল ৮৪টি। সে হিসেবে গত অর্থবছরে বিএফআইইউর পাঠানো প্রতিবেদনের সংখ্যা ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ৮৫টি আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে সিআইডির কাছে। এছাড়া ৩৩টি প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক), ১০টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এবং পাঁচটি প্রতিবেদন অন্যান্য সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। গত অর্থবছরে বিএফআইইউ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে ১ হাজার ৭১টি তথ্য বিনিময় করেছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে মাসুদ বিশ্বাস জানান, বিএফআইইউর তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত অর্থ পাচারের ৫৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুদক মামলা করেছে ৪৭টি, সিআইডি ১০টি এবং এন‌বিআরের বিশেষ সেল দুটি। এসব মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়‌নি।

পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, ‘‌দেশ থেকে একবার টাকা পাচার হয়ে গেলে তা ফেরত আনা খুব কঠিন। ফেরত আনতে অনেকগুলো পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এছাড়া সব দেশের আইন-কানুন একরকম না। তারপরও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা নতুন ১০টি দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা অর্থ পাচার বন্ধে বেশি জোর দিচ্ছি।’

মতবিনিময় সভায় বিএফআইইউর উপপ্রধান মো. রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মো. সরোয়ার হোসেন, সাঈদা খানম, বিএফআইইউর অতিরিক্ত পরিচালক কামাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সুত্র: বণিকবার্তা

পাঠকের মতামত

পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ

‘ঈদ এসেছে দুনিয়াতে শিরনি বেহেশতী/দুষমনে আজ গলায় গলায় পাতালো ভাই দোস্তি’- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ...