প্রকাশিত: ২৭/০৯/২০১৭ ৮:১০ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ১:০১ পিএম

নিউজ ডেস্ক::
রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার। একের পর এক মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচার চালিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি সরাতে চাইছে সেনা কুক্ষিগত দেশটি। এ যেন তাদের নতুন খেলা। সর্বশেষ সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিতর্ক পর্বের শেষ দিনে মিয়ানমারের দূত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিভিম্ন সময় রাখাইনে চলমান সহিংসতাকে ‘জাতিগত
\হনিধন’ বলে বর্ণনা করে আসছে বিভিম্ন দেশ, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। অভিযোগ ধামাচাপা দিতেই বিভিম্ন দেশকে পাশে রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে মিয়ানমার। এরই মধ্যে পুরনো মিত্রদের বরাবরের মতোই পাশে পাচ্ছে তারা। নতুন করে সু চি সরকারের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও জাতিগত নিধন থেকে চোখ ফেরাতে হিন্দুদের ‘গণকবর তত্ত্ব’ আবিস্কার করছে। এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর দেশটির নেত্রী অং সান সু চি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাকে অনুসরণ করে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একই সুরে কথা বলেন তার প্রতিনিধি ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভ্যান থিও। তবে মিয়ানমারের এ ভূমিকায় সন্তুষ্ট নয় জাতিসংঘ। সাত সদস্য রাষ্ট্রের আহ্বানে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিশেষ বৈঠকে বসছে নিরাপত্তা পরিষদ। ধারণা করা হচ্ছে, এখান থেকেই মিয়ানমার প্রভাবশালী দেশগুলোর চাপে পড়বে। এমনকি দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে জাতিসংঘ।

গতকাল মঙ্গলবার মিয়ানমার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সু চিকে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে কক্সবাজারে যেতে বলেছেন জাতিসংঘের সাত বিশেষজ্ঞ। জেনেভায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, রাখাইনে ও কক্সবাজারে যান, দেখে আসুন মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট ও হাহাকার।
এদিকে, রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ ও উচ্ছেদের ব্যাপক আলামত পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরড্িব্নউ)। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলেও আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।

রাষ্ট্রের সঙ্গে অপপ্রচারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী
মিয়ানমারে সু চির সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সব কলকাঠি নাড়ছে দেশটির সেনাবাহিনী। রাজনীতির মাঠে ব্যর্থ সু চি। এ কারণেই জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালানোর পরও সেনাবাহিনীর সুরেই কথা বলতে হচ্ছে একসময়ের আপসহীন নেত্রী এই নোবেল বিজয়ীকে। গত রোববার ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র মতো তারা রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের দাঁড় করানোর অপ্রয়াস চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের ক্ষমতা অটুট রাখতে আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) পেছনেও রয়েছে মিয়ানমার সেনারা।
সেনাবাহিনী বলছে, তারা রাখাইন প্রদেশে একটি গণকবর খুঁজে পেয়েছে, যেখানে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহ রয়েছে। আর এই হিন্দুদের রোহিঙ্গা মুসলমান জঙ্গিরা হত্যা করেছে বলে দাবি তাদের। সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক বিবৃতি বলা হয়, উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশের একটি গ্রাম থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একটি গণকবর খুঁড়ে ২৮ মৃতদেহ উদ্ধার করে, তাদের সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও বেশিরভাগই নারী। তবে বিবিসির মতে, এলাকাটিতে চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকায় সেনাবাহিনীর এ অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব এলাকায় গণমাধ্যম কর্মীরাও প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে তাদের এ দাবি কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত অক্টোবর থেকেই রাখাইনে কোনো গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে দিচ্ছে না মিয়ানমার।

এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, রাখাইনে অভিযানের ছবি ফেসবুক থেকে সরিয়ে ফেলেছে সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাপ্রধান মিন সং হদ্মাইংয়ের অফিসিয়াল ফেসবুকে গত ১ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে পোস্ট করা ছবিগুলো লুকিয়ে ফেলা হয়।
রাখাইনে গত ২৫ আগস্ট থেকে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বিবিসিকে বলেছেন, নির্মম হত্যাকার্ষণ ও বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার কারণে রোহিঙ্গারা আতঙ্ক আর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। গত সোমবার এক বিবৃতিতে মানবিক সহায়তা না বাড়ালে রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ থেকে বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন হাইকমিশনার।
আবারও জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন ও গণহত্যা নিয়ে সু চি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রদূত সবাই ঢালাও মিথ্যাচারে নেমেছে। প্রাণ বাঁচাতে প্রতিদিনই বাংলাদেশে ছুটে আসছে দেশ বিতাড়িত রোহিঙ্গারা। তবুও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের শেষ দিনে সোমবার জাতিসংঘে নিয়োজিত মিয়ানমারের দূত হাউ দো সুয়ান বলেন, আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ওখানে কোনো জাতিগত নিধন ও গণহত্যা হচ্ছে না। তার দেশের ব্যাপারে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য অভিযোগ’ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিভিম্ন সময় গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অভিযোগ এনেছে বিভিম্ন দেশ, জাতিসংঘ, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা। তবুও ফাঁকা বুলিই আউড়ে গেলেন দেশটির দূত।

তিনি আরও বলেন, যেখানে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে মুক্তি ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে, সেখানে তারা কখনোই এই পথ বেছে নেবে না। জাতিগত নিধন ও গণহত্যা প্রতিরোধে আমরা সবকিছুই করব।
রাখাইন রাজ্যের ইস্যুকে তিনি ‘ব্যাপক জটিল’ বলে উল্লেখ করে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতহীন মনোভাব নিয়ে দক্ষিণ রাখাইন এলাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রণ জানান। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠক কাল
মিয়ানমারের চলমান হত্যা, নির্যাতন ও সংকট নিয়ে আলোচনা করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আগামীকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য শুনবেন।

গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে এ বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানায় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদ এ বৈঠকে করতে যাচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্র্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিয়ানমারে সামরিক দমন-পীড়নের কারণে প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এদিকে, গত সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের শেষ দিনে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মিয়ানমারের হালনাগাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে মিয়ানমার
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যা দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরড্িব্নউ)। গত সোমবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গুরুতরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে তাদের মন্তব্যের সপক্ষে রাখাইনে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদের ব্যাপক আলামত উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি। এসব তথ্য-প্রমাণ বিশ্নেষণ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রধান চারটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাদের মতে, অপরাধ সংঘটনের এ ক্ষেত্রগুলো হলো- রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরিত ও বাস্তুচু্যত হতে বাধ্য করা, হত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সন্ত্রাস এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম বিধির বিবেচনায় নিপীড়নমূলক কর্মকা।

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশি ট্রলারে গুলি, মিয়ানমারকে প্রতিবাদ জানাল বাংলাদেশ

টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের মধ্যে চলাচলকারী বাংলাদেশি ট্রলারকে লক্ষ্য করে থেকে গুলি চালানোর ঘটনায় মিয়ানমারকে প্রতিবাদ ...

সেনাবাহিনীর প্রধান হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। আগামী ২৩ জুন তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব ...