প্রকাশিত: ১০/১২/২০২০ ১:১৯ পিএম
ফাইল ছবি

আজিম নিহাদ::

ফাইল ছবি

ঝালমুড়ির প্যাকেটে ঢুকিয়ে অভিনব কৌশলে পাচারকালে ইয়াবার একটি চালান জব্দ করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে চালানটি জব্দ করলেও রাত ১০ টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলেন ডিবির পুরো টিম। ঝালমুড়ির প্যাকেট থেকে সব ইয়াবা বের করেন। তারপর একেকটি করে ঘটনাস্থলে প্রকাশ্যে গুনে ইয়াবার সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করেন জনসম্মুখে।

দৃশ্যটি গত ১৫ নভেম্বর কক্সবাজার শহরের হলিডে মোড়ের ডিবি পুলিশের ইয়াবা অভিযানের। এটি শুধু একদিনের নয়, বর্তমানের জেলা পুলিশের নিত্যদিনের অভিযানের অন্যতম একটি অংশ। প্রতিটি অভিযানে ইয়াবা গণনা করা হয় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলের সম্মুখে।
দেশের সর্বদক্ষিণের এ জেলায় যত ঘটনা ঘটে তার অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা ঘটে ইয়াবাকে কেন্দ্র করে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইয়াবার চালান জব্দ মানেই নানা সন্দেহের জন্ম দেয়। কারণ লোকমুখে প্রচার রয়েছে একটি চালান জব্দ করা হলে তার নির্দিষ্ট পরিমাণের অংশ সোর্সকে দিয়ে দিতে হয়, অন্যথায় সোর্সরা খবর দেয় না। সোর্সের এসব ইয়াবা আবারও বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
আবার চালানের সঠিক পরিমাণ না দেখিয়ে অভিযানকারীরাও একটি অংশ গায়েব করে বলেও প্রচার আছে। ইয়াবা বিরোধী অভিযানের এই বদনামগুলো এতদিন বাজারে প্রচার থাকলেও কোন সংস্থা গায়ে মাখেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইয়াবার এই বদনাম ঘোচাতে ‘জনসম্মুখে গণনা’ করার মত বিশেষ একটি উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

টেকনাফে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের দুঃখজনক ও অনাকাংখিত হত্যাকান্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে পুলিশের সকল কর্মকর্তা এবং কনস্টেবলদের একযোগে উঠিয়ে নেয়। এরপর বর্তমান পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের নতুন টিমের যাত্রা শুরু হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান ইয়াবা বিরোধী অভিযানে বেশকিছু পরিবর্তন এবং নতুনত্ব যোগ করেন। ইয়াবা অভিযান নিয়ে প্রশ্ন এড়াতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে ইয়াবা গণনা করার নির্দেশ দেন প্রত্যেকটি টিমকে। একারণে ঘটনাস্থলে জনসম্মুখে ‘গুনে’ ইয়াবার পরিমাণ নির্ধারণ করে পুলিশ।
নতুন টিমের যাত্রা শুরু হওয়ার পর সর্বপ্রথম ইয়াবা বিরোধী অভিযান শুরু করে ডিবি পুলিশ। সবচেয়ে আলোচিত অভিযান হয় শহরের হলিডে মোড়ের অভিযানটি। অভিযানের সময় সেখানকার স্থানীয় দোকানদারেরা বলছিলেন, প্রকাশ্যে ইয়াবা গণনা করার দৃশ্য এর আগে তারা দেখেননি। পুলিশের মত প্রত্যেকের মধ্যে এরকম স্বচ্ছতা চলে আসলে ইয়াবা নির্মূলে এই উদ্যোগটি অন্যতম ভূমিকা রাখবে।
জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রত্যেক অভিযানে বিশেষ করে ইয়াবার অভিযানে জনসম্মুখে পরিমাণ গণনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ সুপার মহোদয়। আমরা প্রতিটি অভিযানে উপস্থিত সকলের সামনে প্রকাশ্যে ইয়াবাগুলো গণনা করি এবং সিজার লিস্ট করি। তারপর স্বাক্ষীদের স্বাক্ষর নিই।’
পুলিশের উর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেক স্বাক্ষীদের সঠিক তথ্য জানা না থাকার কারণে আদালতে মামলাগুলোর গুরুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। এরফলে আসামী ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। কারণ বেশির ভাগ সময় স্বাক্ষীদের সবকিছু স্পষ্টভাবে না জানিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হত। ফলে এসব মামলা আদালতে গেলে হাল্কা হয়ে যেতো। কিন্তু ঘটনাস্থলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে স্বাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া হলে মামলাগুলোতে কোন ধরণের ঘাটতি থাকবে না। কাজেই প্রত্যেকের উচিত অভিযানে জনসম্মুখে ইয়াবা গণনা করা।
সচেতন মহলের মতে, জনসম্মুখে প্রকাশ্যে ইয়াবা গণনা করলে পুলিশের কোন অফিসার বা সদস্যের ইয়াবা গায়েব করার সুযোগ নেই। কারও বিরুদ্ধে ইয়াবা গায়েবের অভিযোগও উঠবে না। এই সিস্টেমটি প্রত্যেকের চর্চা করা উচিত। তা না হলে সরকারের ইয়াবা নির্মূলের ঘোষণা প্রকৃতপক্ষে আলোর মুখ দেখবে না।
কথিত বন্দুকযুদ্ধে যেসব ইয়াবা কারবারি (সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাবী মতে) নিহত হয় তাদের বডি উদ্ধারেও ইয়াবা দেখানো হতো। এসব ইয়াবা কোথা থেকে আসতো কেউ জানতো না। সচেতন মহলের কাছে এসব বিষয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও কেউ কখনো মুখ খুলতো না। কাজেই ইয়াবা বিরোধী অভিযানে অনেকক্ষেত্রে তেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল না। আইনের কোন ধরণের নিয়ম তোয়াক্কা না করে চলে ইয়াবা অভিযান। এখন পুলিশের এই উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াবা জব্দ করার পরে অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত পিস ইয়াবা জব্দ হয় সেটা তারা জনসম্মুখে গণনা করতো না। থানায় এনে গণনা করতো, এরপর প্রেস রিলিজ দেওয়া হতো। একারণে নানা কথা উঠতো। কিন্তু এখন পুলিশ ঘটনাস্থলে প্রকাশ্যে ইয়াবা গণনার যে উদ্যোগটা নিয়েছে সেটা অত্যন্ত যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এটা শুধু পুলিশ নয়, র‌্যাব, বিজিবি, মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরসহ যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে তাদের প্রত্যেকের এই সিস্টেম মানা উচিত। কারণ আপনি যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চান তাহলে প্রকাশ্যে জনগণের সামনে গণনা করতে হবে। আর আপনার মধ্যে দুর্বলতা না থাকলে কেন প্রকাশ্যে গণনা করবেন না?
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, এটা খুবই ভাল উদ্যোগ। এটাকে বলে ইনভেন্ট্রি। ইয়াবা নিয়ে যেহেতু বাজারে বদনাম আছে এখান থেকে উত্তোরণের জন্য পুলিশের এই পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানায়। একই সাথে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও এই পদক্ষেপটা অনুকরণ করা দরকার।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ইয়াবাসহ প্রত্যেকটি অভিযানে যেন প্রকাশ্যে সবকিছু গণনা এবং সিজার লিস্ট করা হয় এরজন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। ইয়াবাকে কেন্দ্র করে কোন প্রশ্ন যাতে না উঠে সেজন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম পুলিশের প্রত্যেকটি টিম মেনে চলে। ইয়াবা নির্মূল করতে আরও যা যা করণীয় সবকিছু ফলো করা হচ্ছে। সুত্র:
দৈনিক কক্সবাজার

পাঠকের মতামত

কোর্টবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, বেকারি ও মাংসের দোকানকে জরিমানা

 কক্সবাজারের কোর্টবাজারের ভালুকিয়া রোডে মধ্যরত্না রত্নাংকুর বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন একটি বাসায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি ...

রোহিঙ্গাদের দক্ষতা উন্নয়নে ৪৬ কোটি টাকায় পরামর্শক নিয়োগের অনুমোদন

চট্টগ্রাম বিভাগে আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ...

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুসন্ধানে উঠে ...

হলদিয়াপালং ইউনিয়ন বিভাজন পুনর্বিবেচনার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

কক্সবাজারের উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়ন বিভাজনের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ। এতে বক্তারা ...
Single Page Footer