প্রকাশিত: ১৫/০৭/২০১৬ ৭:২০ পিএম

Gram Adalat_0এক।
কথায় বলে, গ্রাম বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।কেননা, বাংলাদেশ মূলতঃ গ্রামময় একটি দেশ।এ দেশের সিংহভাগ মানুষ শহুরে জীবন থেকে দূরে গ্রামীণ সমাজেই বসবাস করেন।বিশাল এই জনগোষ্ঠির দৈনন্দিন আইনি সমস্যার সহজলভ্য ও দ্রুত প্রতিকারে আবহমানকাল থেকেই স্থানীয় বিচার-সালিশের ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই বিচার ব্যবস্থা বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে গ্রাম আদালতের আদলে। দেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদই একেকটি গ্রাম আদালত হিসেবে কাজ করছে।

দুই।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ পাস করা হয় দেশে।এই আইনটি বাতিল করে পরে ২০০৬ সালে নতুন করে গ্রাম আদালত আইন জারি করা হয়।প্রত্যেকটি আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের জন্যে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধিমালা প্রয়োজন বিধায় সেই ১৯৭৬ সালেই পূর্বোক্ত ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশের জন্যে বিধিমালা প্রণীত হয়। ২০০৬ সালে এসে ১৯৭৬ সালের উক্ত অধ্যাদেশটি বাতিল করা হলেও নতুন করে বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় ১৯৭৬ সালের বিধিমালাই অনুসরণ করতে হয়েছে দীর্ঘকাল ধরে।তবে সুখের বিষয়, সম্প্রতি পুরনো ওই বিধিমালার পরিবর্তে নতুন একটি বিধিমালা প্রণীত হয়েছে।গ্রাম আদালত আইনে সংযুক্ত তফসিল অনুযায়ী বেশ কিছু দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধের বিচার-সালিশীর এখতিয়ার রয়েছে এই আদালতের। দেশে মূলধারার বিচার ব্যবস্থা বা কোর্ট-কাচারি জেলা শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত। তাছাড়া, বিভিন্ন কারণে এখানে প্রতিকার প্রাপ্তির বিষয়টিও সময়-সাপেক্ষ আর ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকাংশেই দরিদ্র জনগোষ্ঠির নাগালের বাইরে। ফলে প্রায় বিনাখরচে দ্রুত প্রতিকার প্রাপ্তির/দানের ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে এসেছে।

তিন।
গ্রামীণ জনপদে গ্রাম আদালত এতোকাল বড়সড় একটি ভরসার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিককালে এই আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জাগছে জনমনে।ক্ষমতাসীন সরকারের তরফে ইউনিয়ন পরিষদ ও এর নির্বাচন সংক্রান্ত একাধিক আইন ও বিধিমালা সংশোধন করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে ২০১৫ সালে।এর ফলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য নস্যাৎ হয়ে যাবার পাশাপাশি নির্বাচনকালে স্মরণকালের নিকৃষ্টতম অনিয়ম, সহিংসতা ও প্রহসনের আশঙ্কা তৈরি হয় যা পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সত্যি প্রমাণিত হয়। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা দলীয় মনোনয়নেই নির্বাচিত হয়েছেন।গ্রাম আদালত আইনের বিধান অনুযায়ী, এই আদালতে কোন অভিযোগ দাখিল করা হলে মোট পাঁচ সদস্য-বিশিষ্ট গ্রাম আদালত গঠন করতে হয় যার প্রধান বিচারক হন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। অন্য চারজনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের দুইজন নির্বাচিত সদস্য ও বাকী দুইজন স্থানীয় অধিবাসী হন। তবে এই বিচারে শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানই প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেন। বর্ণিতরুপে আইনে পরিবর্তন আনার পূর্বে তাঁরা নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে কাজ করতে পারতেন। বিচার-প্রার্থীরাও ন্যায় বিচার লাভে উপকৃত হতেন। কিন্তু এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেশে প্রচলিত সংকীর্ণ, পংকিল দলীয় রাজনীতির ক্রীড়নক হওয়া ছাড়া উপায় নেই বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে। তারা এও বলছেন, পরিবর্তিত অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দ্বারা আর যা-ই হোক, ন্যায় বিচার প্রদান করা সম্ভব নয় আর।

চার।
সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। তাই সংবিধানের প্রত্যেকটি বিধান অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হওয়া সমীচীন। অথচ গ্রাম আদালতের পরিবর্তিত ব্যবস্থায় সংবিধানে বর্ণিত জনগণের বিচার প্রাপ্তির অধিকার সংক্রান্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানও লঙ্ঘিত হবার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত কর্তৃক জনগণের দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার প্রাপ্তির অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। আর এ কারণেই কাংখিত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার বিধান সন্নিবেশিত হয় আমাদের আদি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে। যা পরবর্তীতে বিখ্যাত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আওতায় বাস্তবায়িতও হয়েছে।গ্রাম আদালতের প্রধান বিচারক তথা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত হবার কারণে নিজ দল ও দলীয় লোকজনের চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা তাদের পক্ষে এখন আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে-প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এদেশের সিংহভাগ মানুষের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক অধিকার মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

পাঁচ।
গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে রক্তক্ষয়ী এক মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশের জনগণ স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। কিন্তু একালে কী এক সর্বনাশা অমানিশার অন্ধকারে আমরা নিমজ্জিত হয়ে চলেছি প্রতিনিয়ত! সতেরো কোটি আদমের এই দেশে গুটিকয়েক নেতা-নেত্রীর খাম-খায়েশই সব।তারা চেয়েছেন, ব্যাস। ঐতিহ্যবাহী একটি বিচার ব্যবস্থা রসাতলে যাবার যোগাড়। জনগণের নাভিশ্বাস তাদের কাছে কখনও অনিদ্রার কারণ হয়েছে-এমনটি প্রমাণ মেলা ভার।।

মোহাম্মদ শাহজাহানঃ এডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

পাঠকের মতামত

দূষণের দোষী কারা!

“নীরব ঘাতক শব্দ দূষণ করছে রিক্ত নিচ্ছে ভূষণ পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু ঘাতক নিচ্ছে কেড়ে আয়ু” ...