রামুর রাংকুটে ‘বুদ্ধবর্ষ’ বরণ উৎসবে মানুষের মিলনমেলা

কক্সবাজার শহরের ২৭ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নে পাহাড়চূড়ায় ঐতিহাসিক ‘রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার’। ২৫৬৬ ‘বুদ্ধবর্ষ’বরণ উপলক্ষে বিহারে দুই দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর অন্যতম ৮৪ হাজার ধর্মস্কন্ধ (বুদ্ধ) পূজা, ১৫০ জন কুলপুত্রকে গণপ্রব্রজ্যা প্রদান ও ধর্মীয় কীর্তন। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসবে ছুটে আসেন অন্তত ৭০ হাজার পূজারি।

উৎসবের প্রথম দিন গত শুক্রবার দুপুরে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল রাংকুট পরিদর্শন করে।

সঙ্গে ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সিমিন হোসেন রিমি, সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল, সুবর্ণা মুস্তফা, তথ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ও কক্সবাজারের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ, রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা প্রমুখ।

আড়াই হাজার বছরের পুরোনো দেশের ঐতিহাসিক এই বৌদ্ধবিহারের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অশোক। আধুনিক নকশা ও শৈলীতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই বিহার দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসেন।

ফটক দিয়ে বৌদ্ধবিহারে ঢুকলে সড়কের দুই পাশে চোখে পড়ে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় উপাসনারত বুদ্ধের ৮৫টি মূর্তি। বিহারের নিচে বিশাল এক বটবৃক্ষ, যা ১ হাজার ৪০০ বছর আগে সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং ভারত ও বাংলাদেশে বুদ্ধের অবস্থানস্থল আবিষ্কারের সময়ে রোপণ করা হয়েছিল।

বটবৃক্ষের ছায়াতলে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ত্রিপিটক হাতে সম্রাট অশোক মহারাজার ২৩ ফুট উঁচু ভাস্কর্য। বটবৃক্ষের পাশে বিহারে ওঠার প্রধান ফটক। গেটের দুই পাশে দুটি দৃষ্টিনন্দন ড্রাগন। এরপর ৬৭ ধাপের সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়চূড়ায় গেলে দর্শন মেলে গৌতম বুদ্ধের ঐতিহাসিক বিশ্ববুদ্ধমূর্তির। যে মূর্তিতে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি আছে। এ কারণে বিহারের নাম রাংকুট রাখা হয়। রাং অর্থ বুদ্ধের বুকের অস্থি এবং কুট অর্থ স্থানের নাম।

ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারের পরিচালক জ্যোতিসেন থের প্রথম আলোকে বলেন, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন আরাকানের ধন্যবতী নগরের রাজা মহাচন্দ্র সুরিয়ার আমন্ত্রণে গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তৎকালীন সমতটের চৈতগ্রামের (চট্টগ্রাম) ওপর দিয়ে ধন্যবতী নগরে যাওয়ার পথে এখানে (রাংকুট) কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেছিলেন। তখন গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রধান সেবক আনন্দ স্থবিরকে উদ্দেশে ভবিষ্যৎ বাণী করে বলেন, ‘হে আনন্দ!

পশ্চিম সমুদ্রের পূর্ব তীরে রম্যবতী নগরের পর্বত শীর্ষে আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে। তখন এর নাম হবে রাংকুট।’ সম্রাট অশোক বুদ্ধের ৪৫ বছরব্যাপী প্রচারিত ৮৪ হাজার ধর্মবাণীতে বুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীকরূপে বুদ্ধের অস্থি সংযোজিত ৮৪ হাজার চৈত্য স্থাপন করেছিলেন। যার অন্যতম রামুর এই চৈত্য। পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৮ অব্দে আরাকান রাজা চন্দ্রজ্যোতি (চেঁদি রাজা) বুদ্ধে ওই বক্ষাদি সাদা পাথরের ছয় ফুট উঁচু বুদ্ধবিশ্বের মাথায় সংযোজিত করে বুদ্ধবিশ্বটি স্থাপন করেছিলেন।

বৌদ্ধভিক্ষুরা জানান, রাংকুট বিহারের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ বিহার দর্শনে আসেন। আর উৎসবের দিনে বিহার প্রাঙ্গণ লাখো মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার

২৫৬৬ বুদ্ধবর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবের প্রথম দিন গতকাল বেলা দুইটায় শুরু হয় ভিক্ষু শ্রামণের মাধ্যমে ১৫০ জনের চুল ছেদন, সাদা বস্ত্র গ্রহণ ও পরিধান। বেলা ৩টায় ১৫০ জন কুলপুত্রকে গণপ্রব্রজ্যা দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে হাজারো পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। রাতের ভোজন শেষে ১০টায় ধর্মীয় কীর্তন করা হয়। রাত ১২টার দিকে শুরু হয় পূজা।

আজ শনিবার ভোররাত থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। ভোর চারটায় বুদ্ধপূজা উত্তোলন, সাড়ে পাঁচটায় বুদ্ধপূজা উৎসর্গ ও পুণ্যানুমোদন, সকাল সাতটায় ভিক্ষু-শ্রমণের প্রাতরাশ গ্রহণ, সকাল ১০টায় সারমেধ, প্রজ্ঞালোক, জগৎচন্দ্র, প্রজ্ঞাজ্যোতি ও চন্দ্রজ্যোতি মহাথেরদের স্মরণে মহাসংঘদান, বেলা সাড়ে ১১টায় ভিক্ষু-শ্রমণের মধ্যাহ্ন গ্রহণ এবং দুপুর ১২টা থেকে পুণ্যার্থীদের ভোজন। এরপর সমবেত প্রার্থনা সেরে পুণ্যার্থীরা গন্তব্যে রওনা দেন।

বিহারের পরিচালক জ্যোতিসেন থের বলেন, ‘সমবেত প্রার্থনায় আমরা পৃথিবীর সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করেছি এবং করোনা মহামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানিমুক্ত শান্তিময় পৃথিবী প্রত্যাশা করেছি।’

পরিবারের পাঁচজন সদস্য নিয়ে রাংকুট উৎসবে এসেছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি নানুপুরের ইউপি সদস্য আশীষ বড়ুয়া (৫৫)। তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি রয়েছে যে বিহারে, তার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত থাকার সুযোগ নেই। অনেক সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের কাছে এই বিহারের গুরুত্ব অনেক। একই কথা বলেন রাঙামাটি সদরের সবিতা চাকমা (৪০)। স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে দুই দিন আগে রাংকুট এসেছিলেন তিনি। সবিতা চাকমা বলেন, ‘জীবন যত দিন থাকবে, তত দিন রাংকুট দর্শনের আকাঙ্ক্ষা শেষ হবে না।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন