ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ০১/০৯/২০২৬ ১০:৫৮ এএম

​সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে ‘জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬’ অনুমোদিত হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর এই নতুন পে স্কেলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি উপকৃত হবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে অর্থনীতি ও জনজীবনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বেসরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির দাবিও উঠবে, যার প্রভাব পর্যায়ক্রমে পেশাজীবীদের ফিতেও পড়বে—ডাক্তার, প্রকৌশলী ও আইনজীবীদের সেবা গ্রহণের খরচ আরও চড়া হবে।

​কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বেতন বা সেবা ফি বৃদ্ধির সেই সুফল মানুষের পকেটে পৌঁছানোর আগেই চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও সবজির দাম ১৫০% থেকে ২০০% পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। সার্ভিস চার্জ ও যাতায়াত খরচ বাড়াতে বাস মালিকেরা প্রস্তুত, কারণ ড্রাইভার-হেলপারদের অতিরিক্ত মজুরি দিতে হবে। এর ওপর জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ইতোমধ্যে দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বাজারকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের আমিষের একমাত্র ভরসা বাজারের ২০০ টাকা কেজির পাঙ্গাশ মাছের দাম বেড়ে ৪০০ টাকায় পৌঁছাতেও আর বেশি সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে না।

​যেখানে নতুন পে স্কেলের কারণে বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য দেশের সার্বিক চিত্র নিয়ে ভয়াবহ সতর্কতা দিচ্ছে।

​বিশ্বব্যাংকের (The World Bank) মূল্যায়ন: সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতার কারণে দেশে আশঙ্কাজনক হারে নতুন বেকারত্ব তৈরি হতে পারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের চাপের কারণে দেশের কর্মসংস্থান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মহীনতার ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে।

​আইপিসি (IPC) খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ (মে – আগস্ট ২০২৬): দেশের বিশ্লেষিত জনসংখ্যার ১৫% অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার (Phase 3 – Crisis বা তার উপরে) মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে চরম সংকটাপন্ন বা ‘ইমার্জেন্সি’ (Phase 4) ধাপে রয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৩৫% এবং খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামটি ও সুনামগঞ্জের ৩০% মানুষ সরাসরি তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন।

​কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিস্থিতি: কক্সবাজার এবং ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর প্রায় ৩৫% শরণার্থী ‘ক্রাইসিস’ (Phase 3) বা ‘ইমার্জেন্সি’ (Phase 4) মাত্রার তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

আসন্ন অবনতির পূর্বাভাস (সেপ্টেম্বর – ডিসেম্বর ২০২৬): বছরের শেষ চার মাসে তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ১৮ লাখে (মোট জনসংখ্যার ১৮%)। বিপজ্জনক ‘Emergency’ (Phase 4) ধাপে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি এবং নোয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অবস্থা অবনতি ঘটে তীব্র সংকটের দিকে ধাবিত হবে।

​সংকটের মূল কারণ: আকস্মিক বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও খরার কারণে ফসলের ক্ষতি; লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যের চড়া দাম; এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হ্রাসের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রেশন কমে যাওয়া।

​নতুন অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রেখেই মূল বেতন পুনর্বিনধার করা হয়েছে। নতুন এই স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের জন্য প্রাথমিক মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের জন্য নির্ধারিত মূল বেতন ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের ব্যবধান বা অনুপাত ইতিপূর্বে ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ এ নামিয়ে আনা হয়েছে, যার ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পে স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সঙ্গতি ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকার পুরো স্কেল একযোগে বাস্তবায়ন না করে চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে তিনটি ধাপে মূল বেতন এবং ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভাতাসমূহ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে নিম্ন আয়ের ১০ম থেকে ২০ম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্য ধাপে ধাপে নিট পেনশন বৃদ্ধি, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রথমবার প্রতি সন্তানের বিপরীতে মাসিক ৩,০০০ টাকা ভাতা এবং এতদিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা মোবাইল ভাতা সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সম্প্রসারণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা মিডটার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে সংস্থান করা হয়েছে।

​অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো—প্রকৃত উৎপাদন না বাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ালে তা সরাসরি চরম মূল্যস্ফীতি ঘটায়। প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত এই নতুন বেতনস্কেল চালুর মাধ্যমে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ (সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী) লাভবান হলেও, অসাধু বাজার সিন্ডিকেট এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি দেশের সিংহভাগ সাধারণ জনগণ ও নির্দিষ্ট আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ অচল করে দেবে।

​যেখানে বিশ্বব্যাংক নতুন বেকারত্বের মারাত্মক আশঙ্কার কথা জানাচ্ছে এবং আইপিসি প্রতিবেদন বছরের শেষভাগে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পূর্বাভাসের কথা বলছে, সেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন রেখে নতুন পে স্কেলের নামে অতিরিক্ত অর্থ বাজারে ঢালা হলে মুদ্রাস্ফীতির পারদ আকাশ ছুঁইবে। যার বলির পাঠা হবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। অতএব, নতুন পে স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং এর সুফল টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই অবিলম্বে কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম সিন্ডিকেট ভাঙা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম পুনর্মূল্যায়ন এবং কার্যকর অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের প্রধান ও জরুরি দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক,
জিয়াউর রহমান মুকুল,
মানবিক ও উন্নয়ন কর্মী,শেড।
তারিখ: ১/০৯/২০২৬ ইংরেজি।

পাঠকের মতামত

গণভোটে “হ্যাঁ” জয়যুক্ত হলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে:মেয়াদ হবে চার বছর

​২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সময়। একটি বৈষম্যহীন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক ...

“বিগত প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, বাস্তবায়নই হোক উখিয়া-টেকনাফের আগামী”

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত  উপজেলা—উখিয়া ও টেকনাফ। এই জনপদ আজ মাদক, ...

ভুল হোক ফুল

আমাদের এই ছোট্ট জীবনটার পুরোটাই হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্র।যত সময় যাচ্ছে, ততই যেন আমরা নতুন বিষয় ...
Single Page Footer