

সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের কারবার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার এবং ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
তাদের আশঙ্কা, ক্যাম্পে থাকা অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনকালীন সময়ে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ব্যবহার করতে পারে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় যৌথ অভিযানে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ৪৫ জন রোহিঙ্গা আটক হওয়ার ঘটনাও এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে সরকারি হিসেবে এ সংখ্যা প্রায় ১১ লাখে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি হিসাবে তা ১৬ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। উখিয়ার পাহাড়ি জনপদের প্রায় আট হাজার একর জুড়ে গড়ে ওঠা ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হলেও আট বছরের ব্যবধানে এসব ক্যাম্প এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে ও বাইরে নিয়মিতভাবে অস্ত্র ও ইয়াবা কারবার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীরা ক্যাম্পগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতেও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের গ্রাম পশ্চিম পাড়া উত্তর মসজিদের পিছনে শতাধিক রোহিঙ্গা বাড়ি ভাড়া করে অবস্থান নিয়েছে।
জানা গেছে, বিভিন্ন ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়ার একাধিক অংশ কেটে গোপন পথ তৈরি করা হয়েছে। উখিয়ার পানবাজার ও কুতুপালং সংলগ্ন ক্যাম্পে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি স্থানে এমন পথ রয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। নজরদারির ক্ষেত্রেও চরম দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। এপিবিএনের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত প্রায় ৭০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ক্যামেরাও বর্তমানে সচল নেই। ফলে ক্যাম্পের ভেতরের কার্যক্রম নজরদারিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পগুলোতে মাইকিং করে সতর্কতা জারি করা হলেও বাস্তবে রোহিঙ্গাদের চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসরত ৪৫ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এর আগে ২১শে জানুয়ারি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অপারেশন্স ও পরিকল্পনা পরিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সরকারি চিঠিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালীন নাশকতা, অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়। উখিয়া অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল হুসাইন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক নয়, এটি স্পষ্টভাবে আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন, এই সময় ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভুয়া এনআইডি, অবাধ চলাচল ও অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি। ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনসহ পুরো এলাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ক্যাম্পে শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, গোপন পথ বন্ধ এবং নজরদারি জোরদার করা না হলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


পাঠকের মতামত