

সারাদেশের ন্যায় কক্সবাজারেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের সংকট এবং জ্বালানি নিয়ে ভোগান্তিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। একদিকে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে ফসল উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের জ্বালানি সংকটে আয়-রোজগার ব্যাহত হচ্ছে।
রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, সবজি ও ফল-প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসারের ব্যয় বেড়েই চলেছে।
সার সংকট :
কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতিতে কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর একটি হলো সার। কিন্তু মাঠে ফসল উৎপাদনের মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার কিনতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন মতো সার মিলছে না উখিয়ার কৃষকদের।
স্থানীয় দোকান ও ডিলারদের কাছে সার নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদার তুলনায় অল্প পরিমাণ সার পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের কথা জানিয়ে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ডিলার ব্যবসায়ীরা।
কোটবাজারের সার ডিলার ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সার প্রয়োজন ৯০০ টন, অথচ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৯৬ টন। এ অবস্থায় সংকট তো হবেই। উখিয়া উপজেলা ছাড়া অন্য কোথাও তেমন একটা সারের সংকট নেই। একসময় বিভিন্ন এলাকা থেকে উখিয়ায় সার আসত, কিন্তু এখন আর সেভাবে সার ঢোকে না। তাছাড়া কৃষকদের চাষাবাদের পরিমাণ অনুযায়ী কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, সেটিও সঠিকভাবে জরিপ করা হয়নি। ফলে চাহিদা নিরূপণ না করে মনগড়া বরাদ্দ দেওয়া হলে সারের সংকট থেকেই যাবে।”
একাধিক কৃষক বলছেন, সময়মতো জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হবে।
অনেকেই বলছে, সময়মতো জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে একদিকে সার সংগ্রহের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়ে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তবে কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেছেন, সার তো পুর্বের নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ হচ্ছে, তা সঠিকভাবে বন্টনও হচ্ছে। এমন কি অতিরিক্ত বরাদ্দও যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট
জ্বালানি সংকটে চালকদের আয়-রোজগারে টান
কৃষকের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিপাকে পড়েছেন গাড়িচালকরাও। গাড়ি চালিয়ে আয় করাই যাদের প্রধান জীবিকা, তাদের অনেককেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চালকদের অভিযোগ, পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে দৈনিক আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
শামীম নামে এক চালক বলেন, গাড়ি চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া ও অন্যান্য খরচ চালাতে হয়। কিন্তু জ্বালানি সংগ্রহ করতেই যদি দিনের বড় একটি সময় চলে যায় এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়া যায়, তাহলে আয়-রোজগার স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কক্সবাজার লিংক রোডের আশরাফ আলী পাম্পের এক কর্মচারী জানিয়েছেন, তিন দিন পরপর একবার গ্যাস সরবরাহ আসে। এ অবস্থায় নিয়মিত গাড়িতে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর পাশাপাশি গ্যাসের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।
রান্নার গ্যাসের দামেও চাপ
জ্বালানি সংকট শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের বাড়তি দামও সাধারণ মানুষের সংসারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। মাসের নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে অন্যান্য খরচ কমাতে হচ্ছে।
কালোর দোকানে এক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের কোনো সংকট নেই। তবে প্রতি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২০০ টাকা করে বেড়েছে।
গ্যাসের পাশাপাশি মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহৃত অকটেনের দামও সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জ্বালানি খাতে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
ফলের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী দাম
বাজারে গিয়ে ফল কিনতেও স্বস্তি নেই সাধারণ মানুষের। এক কেজি কমলার দাম যেখানে কয়েকশ টাকা, সেখানে অনেক জায়গায় তা ৫৫০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। অন্যান্য ফলের দামও তুলনামূলকভাবে বেশি।
ক্রেতারা বলছেন, আগে পরিবারের সদস্যদের জন্য নিয়মিত ফল কেনা সম্ভব হলেও এখন দামের কারণে অনেকেই ফলের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মৌসুমি ও প্রয়োজনীয় ফল কেনাও অনেকটা বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।
ফ্রুট ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, কমলা আর মালটাই তো মিলছে না, সেখানে আপনি দামের কথা বলছেন! শুধু আমরাই দাম বাড়িয়েছি,বিষয়টি এমন নয়। সবাই তো দাম বাড়িয়েছে। আগে খোঁজ নিয়ে দেখুন।
কাঁচাবাজারে স্বস্তি নেই :
নিত্যদিনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য সবজি কিনতেও বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বাজারে বেগুনসহ বিভিন্ন সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ১০০ টাকার নিচে এক কেজি বেগুন পাওয়া যাচ্ছে না বলে ক্রেতারা জানিয়েছেন। অন্যান্য সবজির দামও বাড়তি।
বাজার করতে আসা এক ক্রেতা বলেন, আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে গেলে ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়ি ফেরা যেত, এখন একই টাকায় প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
মাছের বাজারেও একই চিত্র। সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন মাছের দাম। বাজারে ইলিশের দাম তিন হাজার টাকার নিচে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ক্রেতাদের অভিযোগ। তুলনামূলক ছোট ইলিশ বা জাটকা মাছের দামও অনেক ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকার কমে পাওয়া যায় না।
কানাইয়া বাজারের এক মাছ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু ইলিশ নয়, প্রায় সব ধরনের মাছের দামই বাড়তি। ব্যবসায়ীর ভাষ্য, চলতি বছরের শুরু থেকেই ইলিশের দাম কিছুটা বেশি ছিল। এটি আজকের নতুন কোনো বিষয় নয়, বছরের শুরু থেকেই ইলিশের বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম রয়েছে।
অনেকেই বলছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে মাছ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। একসময় সপ্তাহে একাধিক দিন মাছ কেনা হলেও এখন অনেক পরিবারকে হিসাব করে মাছ কিনতে হচ্ছে।
আয় বাড়ছে না, বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও অধিকাংশ মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। ফলে মাসের শুরুতেই পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে খাদ্য ও জ্বালানি কিনতে।
এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হওয়ায় সংসার চালাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে তুলনামূলক দামি পণ্য বাদ দিচ্ছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক চাকরিজীবী বলেন, “আমাদের দেশে পণ্যের দাম বাড়লেও চাকরিজীবীদের বেতন সেভাবে বাড়ে না। এখনও আগের মতোই ২০ হাজার টাকা বেতন পাই, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে আকাশছোঁয়া হয়েছে। এই বেতনে সংসারের খরচ চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ব্যয় হয়। ফলে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যচাপ তৈরি হলে তাদের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কৃষি উৎপাদন থেকে ভোক্তার বাজার…সবখানেই চাপ
সার সংকট ও কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে। এর সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
ফলে উৎপাদক থেকে ভোক্তা…পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরেই চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
নীরব দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে
প্রতিদিনের বাজার খরচ, জ্বালানি সংকট, কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি,.সব মিলিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে বড় কোনো সংকটের চিত্র দেখা না গেলেও সংসারের খরচ কমাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রতিদিন নানা প্রয়োজন বিসর্জন দিতে হচ্ছে।
★ নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি
★ সার সংকটে দিশেহারা কৃষক
★ জ্বালানি সংকটে চালকদের আয়-রোজগারে টান
★ রান্নার গ্যাসে বাড়তি দামের চাপ
★ স্বস্তি নেই কাঁচাবাজারে
★ মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
★ আয় বাড়ছে না, বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা
কৃষক উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, চালক জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তায়, শ্রমজীবী মানুষ দৈনিক আয়ের হিসাব নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং মধ্যবিত্ত পরিবার মাসের শেষ দিকে সংসারের বাজেট মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে প্রতিটি পণ্যের বাড়তি দাম যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। আর সেই চাপই ধীরে ধীরে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে…যার ক্ষত সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে সাধারণ মানুষ।

পাঠকের মতামত