উখিয়া নিউজ ডটকম
প্রকাশিত: ২৮/১০/২০২৬ ৭:৫২ এএম

​সরকারি কিংবা বেসরকারি যেকোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে নথিপত্রের “ইচ্ছাকৃত ভুল” বা “ইনটেনশনাল মিস্টেক” সাধারণ কোনো অসাবধানতা নয়; এটি আমার কাছে দুর্নীতিরই এক সুমেধাবী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
​বিষয়টি বোঝার জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর অফিসে গেলেন। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিকঠাক জমা দিলেন এবং সরকারি নির্ধারিত ফি-ও পরিশোধ করলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর যখন সনদটি আপনার হাতে আসলো, দেখলেন সেখানে ভুল! হয়তো শিশুর নামে বানান ভুল, বাবা-মায়ের নামে ভুল, অথবা জন্ম তারিখে এমন একটি মাস বা সাল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আপনার মূল সনদে ছিলই না।
​এখন আপনার উপায় কী? আপনি বাধ্য হয়ে আবার সেই অফিসে ছুটবেন ভুল সংশোধনের জন্য। আর তখনই শুরু হয় আসল খেলা—সংশোধনের নামে দাবি করা হয় উপরি টাকা বা অবৈধ ঘুষ, পোহাতে হয় দীর্ঘ লাইনের মানসিক যন্ত্রণা এবং নষ্ট হয় মূল্যবান কর্মঘণ্টা। জরুরি প্রয়োজনে যে কাজটির জন্য সনদটি দরকার ছিল, সময়মতো তা না হওয়ার ক্ষোভ ও লোকসান তো আছেই।
​একই দৃশ্য দেখা যায় ভূমি অফিসে (এসিল্যান্ড অফিস) জমির নামজারি বা মিউটেশনের ক্ষেত্রে। সব নথি ঠিক থাকা সত্ত্বেও নথিতে এমন এক কারণিক ভুল লিখে রাখা হয়, যা সংশোধন করতে গিয়ে নাগরিককে পড়তে হয় দীর্ঘমেয়াদী ‘মিস মামলা’র চক্রে। যে মামলা বছরের পর বছর চলে, আর পেছনে ধ্বংস হয় মানুষের শ্রম, অর্থ ও মানসিক শান্তি।
​জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) প্রথম দেওয়ার পর দীর্ঘ ১৮ বছর পার হয়ে গেলেও মানুষের ভুল সংশোধনের ভোগান্তি আজও শেষ হয়নি। পাসপোর্ট অফিস, আদালতের নথি কিংবা অন্যান্য দাপ্তরিক সেবার চিত্রও আলাদা কিছু নয়। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশের দেওয়ানি আদালতগুলোতে ঝুলতে থাকা মামলার এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি কেবল এসব “কারণিক ভুল” সংশোধনের জন্যই তৈরি হয়।
​প্রশ্ন হলো এই দায় কার? কেন একজন সেবাগ্রহীতা নিজের কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও বারংবার একই অফিসে ঘুরবেন এবং জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত টাকা গুনবেন?
​এই শোষণের চক্র থেকে উত্তরণের উপায়:
​১. বিনামূল্যে ও দ্রুত সংশোধন: সেবাগ্রহীতার আবেদন ও তথ্য সঠিক থাকা সত্ত্বেও যদি নথিতে কোনো ভুল হয়, তবে তা জানার সাথে সাথেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও দ্রুততম সময়ে সংশোধন করে দেওয়া সংশ্লিষ্ট অফিসের আইনি দায়িত্ব হতে হবে। এর জন্য কোনো অতিরিক্ত ফি বা উপরি টাকা দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিক।
২.কর্মচারীদের বাৎসরিক মূল্যায়নে (ACR) অন্তর্ভুক্তি: যে কর্মকর্তা বা কেরানি এই ভুলগুলো করবেন, তার বাৎসরিক কর্মমূল্য প্রতিবেদনে (ACR) এই ভুলের হার রেকর্ড করতে হবে। কার টেবিলে কতটি ভুলের ফাইল তৈরি হচ্ছে, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে হবে।
৩.জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ভুলের কারণে যদি নাগরিক সাফার করে, তবে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে নিতে হবে। প্রয়োজনে অসাবধানতা বা অনিয়মের জন্য বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
​দাপ্তরিক কাজের এসব কথিত “ছোটখাটো ভুল” কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এগুলো প্রকৃতপক্ষে ঘুষ আদায়ের উদ্দেশ্যে তৈরি কৃত্রিম ফাঁদ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি দায়িত্বশীল কার্যালয়ে এই ধরনের ভুলকে দুর্নীতির সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে আমাদের সবার সোচ্চার হতে হবে।

লেখক:
জিয়াউর রহমান মুকুল,
এডভোকেট,
সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত

“​মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকল ও নবম পে স্কেল: সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক চরম বাস্তবতা”

​সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ...

গণভোটে “হ্যাঁ” জয়যুক্ত হলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে:মেয়াদ হবে চার বছর

​২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সময়। একটি বৈষম্যহীন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক ...

“বিগত প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, বাস্তবায়নই হোক উখিয়া-টেকনাফের আগামী”

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত  উপজেলা—উখিয়া ও টেকনাফ। এই জনপদ আজ মাদক, ...