প্রকাশিত: ০৭/০৯/২০২০ ৯:১৬ এএম
ওসি প্রদীপ

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ::

ওসি প্রদীপ

বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ জেলে বন্দী বলে খবর পেয়ে মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানা মালিকরা দুই সপ্তাহ ধরে চালান পাঠায়নি টেকনাফে। পরবর্তীতে সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে ওপারে ইয়াবা ফ্যাক্টরি মালিকদের পরিচয় থাকায় ঘুমধুম-রেজু, টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ফের তারা ইয়াবা আনছে। সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ দায়িত্বে থাকাকালীন একদিকে চাহিদা মতো টাকা না পেয়ে মানুষ হত্যা, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়সহ স্থানীয়দের আতঙ্কে রাখলেও অপরদিকে প্রদীপ তার প্রাইভেট বাহিনী (কতিপয় পুলিশ) দিয়ে ইয়াবার বড় চালান দেশে প্রবেশে শেল্টার দিত বলে জানা গেছে। শামলাপুর নোয়াখালীপাড়া ঘাট, শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, নাইট্যংপাড়া ও হোয়াইক্যং এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান আনত একাধিক সিন্ডিকেট। ওইসব সিন্ডিকেট প্রধানের সঙ্গে ওসি প্রদীপের সরাসরি লেনদেনের সম্পর্ক ছিল। টেকনাফের ওইসব ইউনিয়নের চৌকিদার ও দফাদার ওসি প্রদীপের টাকা উসলকারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে তারাও বর্তমানে কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। ওসি থাকাকালীন প্রদীপকে অন্যায় কাজে সহযোগিতাকারী দালালরা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। টেকনাফের হ্নীলার লেদা এলাকার তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি মৌলবিপাড়ার মুফিজ ও মুহাম্মদ নুরের নেতৃত্বে গঠিত সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবার। ইয়াবা কারবার করে সামান্য বেকার যুবক থেকে তারা বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

জানা গেছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশী অভিযান কিছুটা বন্ধ থাকায় ইয়াবা কারবারি মুহাম্মদ নুর, উনচিপ্রাং এলাকার কথিত ঠিকাদার বাইলার পুত্র খলিল চৌধুরী নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। মাত্র কয়েকদিন আগেও ওই সিন্ডিকেটের ৪ লাখ পিস ইয়াবার চালান নাফ নদীর লেদা খাল থেকে খালাস করা হয়েছে। ইয়াবা চালানটি জনৈক আরিফের বাড়িতে রেখে ওখান থেকে সরবরাহ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। লেদার এই আলোচিত ইয়াবা গডফাদার মুহাম্মদ নুরের সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হচ্ছে লেদার মৌলবিপাড়ার মুফিজ, পশ্চিম লেদার নুর কবির, আরিফ, ইউছুপ ও উনচিপ্রাং এলাকার পিচ্চি খলিল। বাইলার পুত্র ওই পিচ্চি খলিলের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জড়িত থাকা বিষয়ে মামলাও রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের খুঁজলেও কৌশলে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্রে প্রকাশ, সুচতুর ওই সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রশাসনের নজরে পড়তে নারাজ। তাই তারা বাড়ি নির্মাণ করলেও বাড়িতে তেমন কোন চাকচিক্য বা কারুকাজ করেনি। এলাকাবাসী জানায়, ইয়াবা গডফাদারদের রাজ্য হিসেবে পরিচিত হোয়াইক্যং, হ্নীলা-লেদা এলাকার সেই পুরানো গডফাদাররা এখন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নাফ নদী থেকে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের অন্ধকারে ইয়াবার বড় বড় চালান এনে পশ্চিম লেদা আরিফের বাড়িতে মজুদ করে প্রথমে। পরে সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন- তাদের আয়ের উৎস কি? দুদকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের সম্পদ খুঁজে বের করলে থলের বেরিয়ে আসবে। ওই সিন্ডিকেটের অনেকে ইয়াবাসহ আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে বর্তমানে জামিনে মুক্ত হয়ে ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছে।

জব্দকৃত মোটরসাইকেল ভাগাভাগি ॥ ইয়াবাসহ জব্দ এবং ইয়াবা কারবারি বলে অভিযোগ এনে ওসি প্রদীপ ও তার নির্দেশে টেকনাফে তার প্রাইভেট বাহিনী গত দুই বছরে অন্তত শতাধিক মোটরসাইকেল জব্দ করেছিল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ওইসব মোটরসাইকেল তাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেছে। সড়কপথে চালিয়ে অথবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ওসি প্রদীপের প্রাইভেট বাহিনী কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে ওই মোটরসাইকেলগুলো। কক্সবাজার জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারীভাবে নিয়ম রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক জব্দকৃত যে কোন পণ্য (নিলাম যোগ্য) প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ডাককারীর ওই টাকা সরকারী কোষাগারে জমা করতে হবে। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ওসি প্রদীপ জব্দকৃত মোটরসাইকেলগুলো নিলামে বিক্রি না করে তার ব্যক্তিগত বাহিনীকে খুশি রাখতে এই অবৈধ কাজ করে প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করেছে।

ইয়াবার চালান গায়েব ॥ টেকনাফ থানা পুলিশ যেসব ইয়াবার চালান জব্দ করেছে, তারমধ্যে বেশিরভাগ ইয়াবার চালান থানা হেফাজতে রক্ষিত নেই বলে জানা গেছে। ওসি প্রদীপ দায়িত্বে থাকাকালীন ওইসব ইয়াবা তার কিলারগ্রুপখ্যাত প্রাইভেট বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যম বিক্রি করে দিয়েছে। থানার মালখানা বা হেফাজতে রাখা গুদামে তল্লাশি চালালে ওসি প্রদীপের আগে ও তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জব্দকৃত ইয়াবার পরিমাণ সিজারলিস্ট মতে পাওয়া যাবে না বলে সূত্রটি আভাস দিয়েছে।

বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ ॥ টেকনাফ মডেল থানার সাবেক বিতর্কিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ক্ষমতার অপব্যবহার ও তার বাহিনী দিয়ে ১৫ বছরের ভোগদখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে শহীদ উল্লাহ নামে এক নিরীহ ব্যক্তিকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা সম্রাট টেকনাফ পৌরসভা নাইট্যংপাড়ার ১নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজী মোঃ ইউনুছ ওসি প্রদীপের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে এহেন ঘৃণ্যতম কাজটি করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। জমি মালিক মোঃ শহিদ উল্লাহ জমি বসতভিটা ফিরে পেতে ও হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সরকারী বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেছেন। চারকক্ষ বিশিষ্ট একটি সেমিপাকা ঘর ২৫ হাজারের অধিক বনজ ও ১৫ হাজারের অধিক ফলদ গাছের চারা রোপণ করে নার্সারি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল তার পরিবার। জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় টেকনাফ মডেল থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি সাবেক কমিশনার মোঃ ইউনুছ ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে প্রদীপ দাশের প্রাইভেট বাহিনী পুলিশের সহায়তায় ওই জমি থেকে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই তাদের উচ্ছেদ করে দিয়েছে।

পাঠকের মতামত

স্পা সেন্টারের আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, নারীসহ গ্রেপ্তার ৫৪

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে স্পা সেন্টারের আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ...

টেকনাফে মাদক গডফাদারদের ১৮২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া,তালিকায় আছে যারা

মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ১১৬ জন গডফাদারের ১৮২ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের ...
Single Page Footer