ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৮/০৭/২০২৬ ১০:৩৭ এএম

সমুদ্রে প্রতিদিন শত শত জেলে মাছ ধরতে যান, সমুদ্রসৈকতে নামেন হাজারো পর্যটক; আর আকাশে ওড়ে বিমান। অথচ প্রাণ ও সম্পদ রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া কক্সবাজারের ডপলার আবহাওয়া রাডার গত তিন বছর ধরে অচল। ফলে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়ার গতিপ্রকৃতি সময়মতো শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জেলে, ট্রলার মালিক, পর্যটকসহ উপকূলের মানুষের উদ্বেগও বেড়েছে।

কক্সবাজার দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা। প্রতিদিন গভীর সমুদ্রে যান শত শত জেলে, সৈকতে ভিড় করেন হাজারো পর্যটক এবং বিমানবন্দর দিয়ে নিয়মিত উড্ডয়ন ও অবতরণ করে বিমান। অথচ এই পুরো উপকূলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কক্সবাজার ডপলার রাডার তিন বছর ধরে অচল।

এই রাডার ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার গতিপ্রকৃতি দ্রুত শনাক্ত করে ঢাকায় তথ্য পাঠাত। কিন্তু যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে রাডারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস, মেঘের সৃষ্টি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কক্সবাজারে বিমানবন্দর থাকায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রেও রাডারের তথ্য বিশেষ সহায়ক। অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হওয়া মেঘের অবস্থান, প্রকৃতি ও গতিপথ নির্ধারণেও এর গুরুত্ব অনেক। রাডার থেকে পাওয়া তথ্য ঢাকায় পাঠানো হতো। সেখানে বিশেষজ্ঞরা সেগুলো বিশ্লেষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করতেন। কিন্তু রাডার অচল থাকায় এখন সরাসরি এই তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

বিমানবন্দরের জন্য আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি ঘণ্টায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের মাধ্যমে পাইলটদের তাপমাত্রা, শিশিরাঙ্ক (ডিউ পয়েন্ট), আর্দ্রতা, কিউএনএইচ (বায়ুচাপ), দৃশ্যমানতা, বাতাসের গতি ও দিকসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া হয়। এছাড়া বৃষ্টিপাত, মেঘের উচ্চতা ও প্রকৃতির তথ্যও সরবরাহ করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন বজ্রঝড় বা ঘন মেঘের সময়, প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর তথ্য হালনাগাদ করা হয়।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা কমে গেছে। গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জেলেদের একমাত্র ভরসা রেডিও। তাই হঠাৎ দুর্যোগের আগাম সতর্কতায় ডপলার রাডার ছিল সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি। শুধু জেলেদের জন্য নয়, সমুদ্রসৈকতে থাকা পর্যটক ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে বাদশা মিয়া বলেন, সমুদ্রে কিছু দূরে যাওয়ার পরই অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তখন আবহাওয়া খারাপ হলে পরিবারও জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। এতে পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় থাকেন।

এফবি গালিব ট্রলারের মাঝি শামশুল আলম বলেন, কক্সবাজার উপকূল থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গেলেই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। অথচ অনেক সময় তারা ২০০ থেকে ২২৪ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। ফলে ঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম তথ্য পাওয়া সম্ভব হয় না। নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, রাডার স্টেশন অকার্যকর থাকায় সময়মতো সমুদ্রের আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে হাজারো জেলে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। একটি মাছ ধরার ট্রলারে কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিও হয়। তাই দ্রুত রাডার সচল করতে হবে।

সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাডার অকার্যকর থাকায় প্রয়োজনীয় সময়ে নির্ভুল আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজার ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা হওয়ায় আগাম তথ্য পাওয়া গেলে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে।

২০২৩ সালে রাডার সচল করতে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার কাছে কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তবে সাড়া না পাওয়ায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নে রাডার আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালে জাপানি বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করে ভবনটি ব্যবহারযোগ্য বলে মত দিলেও নতুন যন্ত্রপাতি বসানোর সুপারিশ করে। কিন্তু এখনো কাজ শুরু হয়নি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারের রাডারটি ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত চালু ছিল। পরে যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা কয়েক দফা চেষ্টা করেও এটি সচল করতে পারেননি। শুধু কক্সবাজার নয়, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডারও একই সঙ্গে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইও শেষ হয়েছে। জাপানের প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, বর্তমান ভবন ও অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য রয়েছে, শুধু পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলাতে হবে। প্রকল্পটি এখনো মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রতি মাসেই এ বিষয়ে ঢাকার দফতর থেকে চিঠি আসে। তবে এখনো প্রকল্প অনুমোদনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারকে ‘মাল্টি হ্যাজার্ড’ জেলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও ভারি বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৪ সালে একদিনে ৫৫০ মিলিমিটার এবং সাত দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। এ ধরনের দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতায় আধুনিক আবহাওয়া রাডারের বিকল্প নেই। দ্রুত নতুন রাডার স্থাপন করা গেলে জনগণকে আরও কার্যকর আবহাওয়া সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

আবহাওয়া অফিসের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানান, কক্সবাজার অফিস মূলত একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এখানে সরাসরি পূর্বাভাস তৈরি করা হয় না। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসের গতি ও দিকসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। বেলুনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বাকাশের তথ্যও পাঠানো হয়। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে পূর্বাভাস তৈরি করে তা গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। রাডার অচল থাকায় বর্তমানে পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ ও ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আ. মান্নান বলেন, বিষয়টি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে এবং এর আগেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায়, সমতল থেকে ১৬০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই রাডার স্টেশনটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৭ সালে জাপানের সহায়তায় এটিকে আধুনিক ডপলার আবহাওয়া রাডারে উন্নীত করা হয়

পাঠকের মতামত

 

২০ টনের বেশি বর্জ্য অপসারণ, স্থায়ী সমাধানে ডাম্পিং স্টেশন চায় বিডি ক্লিন উখিয়া

দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন উখিয়া টিমের উদ্যোগে ১৪তম পরিচ্ছন্নতা অভিযান ...

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি জনগণের সরকার, সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ...

রাজাপালং ভেঙে হচ্ছে ‘উয়ালাপালং’ ইউনিয়ন, গণশুনানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়ন বিভক্ত করে ‘উয়ালাপালং’ নামে নতুন একটি ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ...

টেকনাফে ইউনিয়ন বিভক্তি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি; নেতৃত্বের দ্বন্ধে বাড়বে জন ভোগান্তি

কক্সবাজারের টেকনাফে নতুনভাবে কয়েকটি ইউনিয়ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাগেছে। নাগরিক সেবা ত্বরান্বিত করতে উপজেলার ...

কক্সবাজারে বন্যা কবলিত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাচ্ছিলেন, পথে প্রাণ গেল বন্ধুর

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মো. মানিক উদ্দিন নাহিদ ...

কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবা পাচার, আটক ৩

মাদক পাচারে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে সন্দেহ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল ...