
শহিদুল ইসলাম,উখিয়া::
কক্সবাজারের উখিয়ার কয়েক যুগের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নিজেদের আবাদি জমি, বসতভিটা সবই মানবতার খাতিরে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ছেড়ে দিয়ে বিপদে পড়েছেন। প্রায় দুই বছর ধরে চাষাবাদ ছাড়াও গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি কিছুই লালন-পালন করতে পারছেন না তারা। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থানীয় লোকজন ক্রমশ নিজেরাই উদ্বাস্তু হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কোন সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য তাদের নেতা বা মাঝি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা সম্পন্ন সিনিয়র সহকারী সচিব, উপ-সচিব, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও সহ অনেকে রয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দাতা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় লোকজনের কষ্ট শোনার ও বোঝার মত কেউ নেই।
সরেজমিনে খোঁজ করে দেখা যায়, উখিয়ার কুতুপালং মেগা আশ্রয় শিবিরের ৭ নং ক্যাম্পের অভ্যন্তরে যুগ যুগ ধরে পরিবারসহ বসবাস করে আসছেন ৪৩ টি পরিবার। এলাকাটিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কেন্দ্র থাকায় সকলের কাছে টিভি টাওয়ার নামে পরিচিত। পাহাড়, টিলাময় অঞ্চলটি হওয়ায় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পূর্বে এটি ছিল বন বিভাগের
বিস্তীর্ণ সামাজিক বনায়ন এলাকা। অনেক আগে থেকে ওই এলাকায় স্থানীয় এসব পরিবার বসতি গড়ে তোলায় বন বিভাগ তাদের সামাজিক বনায়নের অংশীদার ভুক্ত করে নেয়।
টিভি টাওয়ার সংলগ্ন তেলিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, প্রায় এক একরের মতো আমার বসতভিটা। আমার ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়ে। দুই বছর আগে মানবতার খাতিরে আমারসহ এখানকার সকলের বসতভিটায় রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দিয়েছিলাম। আমার বসতঘরের সামনে লম্বালম্বি একটি ঘর। প্রথম দিকে জরুরি প্রয়োজনে সরকারি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অফিস ঘর ছিল সেটি। তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা নতুন অফিস হলে সব স্থাপনা ভেঙে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখন নতুন অফিস হয়েছে কিন্তু উঠান থেকে স্থাপনা সরেনি। উক্ত পরিত্যক্ত অফিস ঘরে বিভিন্ন এনজিওর লোকজন মিটিং-বৈঠক করছে। এতে বউ-ঝিয়েদের নানা সমস্যা হলেও কেউ শোনার নেই বলে তিনি জানান।
স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের মধ্যে সোনা আলী, মনছুর আলী, নুরুল আলম, গিয়াসুর সহ অনেকে এই প্রতিবেদককে বলেন, ডিসি, ইউএনও সহ বিভিন্ন জায়গায় তদবির করে দেড় বছর পর পাঁচ একর পরিমাণ দুই ফসলি জমি রোহিঙ্গাদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে সেচের জন্য তেলিপাড়া খালে বাঁধ দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা তিনবার বাঁধ ভেঙে দেওয়ায় চাষ করতে সমস্যা হচ্ছে।
মো. আলী জানান, রোহিঙ্গারা সামাজিক বনায়নের গাছ-পালা কেটে অনেক আগে সাবাড় করেছে। এখন ঘর বাড়ির আশপাশে বসত ভিটার ফলজ গাছ পালা কেটে নিচ্ছে। রোহিঙ্গা ছেলে মেয়েদের জন্য বাড়ির গাছপালার আমসহ কোন ফলই রাখা যাচ্ছে না। নিষেধ করলে উল্টো ঝগড়া করে। তিনি স্থানীয়দের জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের অবস্থান সরিয়ে নেওয়ার দাবি করে বলেন, এরা খুবই ভয়ংকর। যে কোন অঘটন ঘটাতে দ্বিধাবোধ করে না।
সরকারি দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বললেও কোন প্রতিকার মিলছে না জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বসতভিটা, ঘর-বাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া কোন পথ থাকবে না।
এ ব্যাপারে কুতুপালং -৭ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ আল মুজাহিদ বলেন, আমার ক্যাম্পে ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার অবস্থান। পক্ষান্তরে ক্যাম্পের ভেতরে মাত্র ৪৩ পরিবারের বসতি। তারা বন বিভাগের জমিতে সরকারের বনায়ন কর্মসূচির অংশীদার । এরপরও তাদের কোন সমস্যা হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হবে। এত রোহিঙ্গাদের মাঝে স্থানীয়রা নানাবিধ সমস্যায় পড়ছে বলে তিনি স্বীকারও করেন।

পাঠকের মতামত