ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৭/১০/২০২৬ ১০:৩০ পিএম

কক্সবাজারের উখিয়া সদরের দারোগা বাজার কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর ও জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে। উপজেলা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ভাঙচুর হওয়া অংশ পুনর্নির্মাণ, অনিরাপদ ফাঁকা স্থানে টিনের বেড়া এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে শ্মশান ও সংলগ্ন দুর্গামন্দিরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এতে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করছেন স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সপ্তমী পূজার দিনে দারোগা বাজার সমাজ শ্মশান ভৈরব ও দুর্গামন্দির উন্নয়ন এবং পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে শ্মশানের জমি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তুলে ধরেন পরিষদের প্রতিনিধিরা।

পরিচালনা পরিষদের দাবি, সরকারি খতিয়ান ও দাগসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, শ্মশানের নামে ১ একর ১২ শতক জমির রেকর্ড রয়েছে। তাদের ভাষ্য, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় এই ভূমি শ্মশান হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকা শ্মশানের দক্ষিণ পাশের আনুমানিক ১৫ শতক জমি সংলগ্ন এলাকার কিছু ব্যক্তি অবৈধভাবে দখলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিষদ। এতে মৃতদেহের সৎকার ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

শ্মশানের জমি উদ্ধারের জন্য ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব আদালতে উচ্ছেদ মামলা করা হয়, যার নম্বর ০২/০৭-০৮। পরিচালনা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর উচ্ছেদের আদেশ দেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, প্রয়াত জাকের হোছন মুন্সি ১৯৮৬ সালে শ্মশানের শ্রেণি পরিবর্তন করে ৪০ শতক জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেছিলেন বলে জানায় পরিষদ। তাদের বক্তব্য, বন্দোবস্তের আবেদন করলেই জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না; এ ক্ষেত্রে যথাযথ সরকারি অনুমোদন ও ভূমি-সংক্রান্ত নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ।

পরিচালনা পরিষদের তথ্যমতে, সাহাব উদ্দিন গং ২০১২ সালে জমির স্বত্ব ঘোষণার দাবিতে উখিয়ার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। ২০১৯ সালের ৩০ মে ওই মামলায় সরকার ও শ্মশানপক্ষের অনুকূলে রায় আসে। পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে আপিল করা হয়। পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের রায়ে বাদীপক্ষকে ৪০ শতক জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার হকদার বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হলেও সরকারকে জমি বন্দোবস্ত দিতে বাধ্য করা হয়নি। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন মামলা করা হয়, যার নম্বর ২৬৮১/২০২১। পরিষদের দাবি, মামলাটিতে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং ২০২২ সালের ৮ জুনের আদেশে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল রাখা হয়।

পরিচালনা পরিষদ জানায়, ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধপূর্ণ ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। ওই সময় ভূমি জরিপের মাধ্যমে সীমানা চিহ্নিত করা হয়। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি সমঝোতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি পরিষদের। তবে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময় মাঝের একটি গাছ ও সংলগ্ন জায়গা নিয়ে আপত্তি ওঠায় কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে শ্মশানের সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় বলে জানায় পরিচালনা পরিষদ। তাদের ভাষ্য, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে পূজা উদযাপন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরীর পরামর্শ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরোয়ার জাহান চৌধুরীর মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় ভাঙচুর হওয়া অংশ পুনর্নির্মাণ, ফাঁকা স্থানে টিনের বেড়া স্থাপন ও সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়।

পরিচালনা পরিষদের দাবি, হাইকোর্টে চলমান মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ স্থানে কোনো পক্ষ প্রবেশ করবে না বলে উভয় পক্ষ প্রশাসনের কাছে লিখিত অঙ্গীকার করেছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট স্থান উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এ ব্যবস্থার ফলে শ্মশান ও সংলগ্ন দুর্গামন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পূজা উদযাপনের পরিবেশ ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।

পরিষদ আরও জানায়, ২০১১ সালের ১৮ মে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে শ্মশানভূমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে জেলা প্রশাসক, কক্সবাজারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। শ্মশানের পবিত্রতা রক্ষা, মৃতদের শেষ ঠিকানা সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য বলে জানান প্রতিনিধিরা।

দারোগা বাজার সমাজ শ্মশান ভৈরব ও দুর্গামন্দির উন্নয়ন এবং পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে মাস্টার মুকুন্দ প্রসাদ রুদ্র, সাংবাদিক রতন কান্তি দে ও অ্যাডভোকেট রবীন্দ্র দাশ রবি এ বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন।

তাঁরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণ, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান। দীর্ঘদিনের এই বিরোধে আপাতত নিরাপত্তা ও পূজা উদযাপনের পরিবেশ ফিরলেও জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

পাঠকের মতামত

চলে গেলেন ঢাবি-জবি-ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ পরিবারের ৬ জন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ ...

ভুয়া এনআইডিতে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন ফেরানোর চিন্তা

জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের পর ওই পরিচয়ে পাসপোর্ট বানাচ্ছেন কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা। ...

নিরাপত্তা জোরদারে টেকনাফের হ্নীলায় হচ্ছে সেনা ক্যাম্প, চলছে স্থান নির্ধারণের কাজ

কক্সবাজারে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বড় ডেইল এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের ...