
৮ মে বুধবার। বেলা আড়াইটা। ফটিকছড়ি থেকে বাসে চড়ে নগরের মুরাদপুর আসছিলেন মুদি দোকানদার ইলিয়াছ মিয়া। বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন অক্সিজেন পুলিশ বক্সের সামনে ইশারা দিলে বাসটি থামে। তল্লাশি করতে বাসে উঠে পড়েন কয়েকজন পুলিশ সদস্য (নেমপ্লেট ছিল না)। মিনিট পাঁচেক পর ওই বাসের ইলিয়াছসহ তিন যুবককে নামিয়ে আনে পুলিশ।
ইয়াবা বহনের সন্দেহে পুলিশ বক্সের ভেতরে নিয়ে তাদের দেহ তল্লাশি করেন তারা। ওই তিন যুবক মাদক ব্যবসায় জড়িত নয় বলে জানানোর পরও তাদের শরীর এক্সরে করাতে হবে ধমক দেন এক পুলিশ সদস্য। অক্সিজেন এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্সরে করে মাদকের অস্তিত্ব না পেয়ে ২০-২৫ মিনিট পর অবশেষে ওই তিন যুবককে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
গত বুধবার বেলা দেড়টা থেকে সাড়ে আড়াইটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা ওই পুলিশ বক্সের সামনে অবস’ান করে মাদক তল্লাশির নামে পুলিশ কর্তৃক নিরীহ যাত্রীদের হয়রানির এমন দৃশ্য দেখতে পান এ প্রতিবেদক। অভিযোগ, অক্সিজেন পুলিশ বক্সে মাদক তল্লাশির নামে নিরীহদের হয়রানির চিত্র নিত্যদিনের। এ চেকপোস্টে মাদক তল্লাশির নামে বিভিন্ন মানুষের কাছে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানাভাবে ভয় ভীতি দেখানো হয়।
জানতে চাইলে বায়েজিদ থানার ওসি খোন্দকার আতাউর রহমান বলেন, ‘মাদক কিংবা অবৈধ কিছু তল্লাশিকালে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে কিছু কষ্ট শিকার করতে হবে এমনটা স্বাভাবিক। তবে তল্লাশির নামে কাউকে হয়রানি করা যাবে না।’
খবর নিয়ে জানা গেছে, শুধু অক্সিজেন নয়, তল্লাশির নামে নগরজুড়ে পুলিশি হয়রানির এ চিত্র নিত্যদিনের। ভুক্তভোগী কলেজছাত্র আজম খান বলেন, ‘দুর্বৃত্তদের দেখলে মানুষ যেমন ভয় পায়, তেমনি পুলিশ চেকপোস্ট দেখলেও মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। চেকপোস্টে দায়িত্বপালনকারী পুলিশ সদস্যরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।’
নাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা আবদুস সোবহান জানান, গত ৬ মে সকালে সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে নগরের নিউমার্কেট যাচ্ছিলেন তিনি। অক্সিজেন মোড়ের চেকপোস্টে তাকে বহনকারী অটোরিকশাটি থামায় পুলিশ। এসময় তার পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার শঙ্কায় পড়ে যান আবদুস সোবহান। তল্লাশিকারী পুলিশ সদস্যকে সোবহান বলেন, ‘ভাই আমার নিকট ছেলে মেয়ের জন্য পোশাক কেনার টাকা আছে। আপনি পকেটে হাত দেবেন না।’
নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার একাধিক দোকানদার জানান, চান্দগাঁও থানা পুলিশের চেকপোস্টে প্রতিদিন নিরীহ মানুষ হয়রানি শিকার হচ্ছেন। পথচারী, যাত্রী কিংবা শিক্ষার্থীদের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা
আদায় করে পুলিশ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চান্দগাঁও থানার ওসি আবুল বশর।
অভিযোগ আছে, নগরের গণি বেকারি, সার্সন রোড, পলিটেকনিক্যাল, আমবাগান ভাঙারপুল, জাকির হোসেন রোডের চক্ষু হাসপাতালের সামনে, একই সড়কের এমইএস কলেজ কবরস’ান, পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, পাঁচলাইশ থানাধীন বনগবেষণা ইনস্টিটিউট, সিআরবি, আগ্রাবাদ, সল্টগোলা ক্রসিং, বিমানবন্দর সড়ক, টাইগার পাসসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশির নামে নারী-পুরুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।
হোসেন আহমেদ নামে এক ভুক্তভোগী জানান, সম্প্রতি রাত ১টার দিকে হাটহাজারীর আমানবাজার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বহদ্দারহাটের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। এসময় অক্সিজেন পুলিশ বক্সে অহেতুক তাকে এক ঘণ্টা আটকে রাখে পুলিশ কনস্টেবল। তাকে ইয়াবা, চুরিসহ বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হয়।
এর আগে গতবছর এপ্রিল মাসে পাহাড়তলী থানা এলাকায় ছেলের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে হয়রানি করার অভিযোগে মেহেররুন্নিসা নামে এক নারী আদালতে পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি রফিকুল ইসলামসহ সাত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মেহেরুন্নিসার অভিযোগ, ওই বছর ২৫ এপ্রিল রাতে টহল পুলিশ তার ছেলে মেহেদি হাসানকে রাস্তা থেকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়ে তিন লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে তার ছেলের পকেটে ৪০টি ইয়াবা পাওয়ার অভিযোগে মামলা দেয় পুলিশ। পরদিন মেহেদীকে আদালতে চালান দেয় পুলিশ। আদালতের নির্দেশে পিবিআই এ ঘটনা তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
ওমেশ চন্দ্র নামে এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, চেকপোস্টে আতঙ্কজনক তল্লাশি চালায় পুলিশ। রিকশা কিংবা গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রথমেই কয়েকজন পুলিশ মিলে সংশ্লিষ্ট পুরুষকে ঘিরে ধরে। এরপর সারা শরীরে তল্লাশি চালায়। সঙ্গে থাকা মানিব্যাগ হাতড়েও দেখে পুলিশ। অনেক সময় মানিব্যাগ থেকে টাকাও রেখে দেয়। নারী-পুরুষ একসাথে যাতায়াত করলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। স্বামী-স্ত্রী হলেও নিস্তার নেই। একদিকে স্বামী অন্যদিকে স্ত্রীকে নিয়ে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করাসহ কাবিননামা দেখতে চাওয়ার অভিযোগ আছে কিছু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে।

পাঠকের মতামত