প্রকাশিত: ২৮/০২/২০১৭ ৯:২৪ এএম

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে দলের নেতা-কর্মীদের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বশেষ দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও সরকারের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়া কথা বলেছেন। তবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন না বর্তমান সংসদের কমপক্ষে ৭০ জন সংসদ সদস্য।

গণভবনের একটি সূত্র পূর্বপশ্চিমকে নিশ্চিত করেছে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী খুঁজছে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। দশম সংসদে নৌকা প্রতীকে এমপি হয়েছেন ২৩৪ জন। দুই এমপির মৃত্যুতে গাইবান্ধা-১ ও সুনামগঞ্জ-২-এ দুটি আসন ফাঁকা রয়েছে। সেখানে আগামী ২২ ও ৩০ মার্চ উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দুটি আসনেই দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কাজটিও সেরে ফেলেছে আওয়ামী লীগ।

তবে, আগামী নির্বাচনে বর্তমান সংসদের বিতর্কিত, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে চলেন, জনবিচ্ছিন্ন এমন প্রায় ৭০ এমপির কপালে নৌকার টিকিট জুটছে না। বিতর্কের মধ্যে না থেকেও কিছু এমপি মনোনয়ন পাবেন না- কারণ তাদের চেয়ে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থীর সন্ধান রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। অনেকেই আবার বয়সের ভারে সরে দাঁড়াচ্ছেন নিজ থেকেই।

রাষ্ট্রীয় এক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র মতে, বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত; কিন্তু ভোটে পাস করে আসার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় অনেক বিতর্কিত এমপির হাতেও পুনরায় উঠতে পারে নৌকার টিকিট। আগামী নির্বাচনকে তারা খুব ‘সিরিয়াস’ মনে করছেন। তাই পাস করে আসতে পারবেন না এমন এমপিদের আগামী নির্বাচনে নৌকায় না তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুধু এমপিকেন্দ্রিক না হয়ে, তৃণমূলেও নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন দলীয় নেতারা। ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারির ৯০ দিন আগে- অর্থাৎ, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর বা নভেম্বরেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন খবরও তৃণমূলে দেয়া হয়েছে। বিজয় দিবসের টানা অনুষ্ঠানের কারণে নভেম্বরেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাই পুরোদমে নির্বাচনী প্রস্তুতির আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগে ভাগেই সবুজ সংকেত দেয়ার বিষয়টিও ভাবছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের জন্য আগে থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় কোন্দল মেটাতেও অনেক সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের বেশ ক’জন নেতা বলছেন, আওয়ামী লীগের মাথায় এখন শুধু আগামী নির্বাচন। উন্নয়ন কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতাও চান তারা। আর বিএনপি যে কোনো চাপের মুখে থাকলেও আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নেবে। তাই জনপ্রিয় প্রার্থী ছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বেশ বেকায়দায় পড়বে- এমন চিন্তা শাসক দলের হাইকমান্ডের। জনপ্রিয় প্রার্থীর স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন, সারাদেশে আইভীর মতো প্রার্থী খুঁজতে।

তবে বর্তমান অনেক এমপি যারা ইতিমধ্যে নিজের বলয় সৃষ্টি করে ফেলেছেন, মনোনয়ন না পেলে কলহ-বিবাদে লিপ্ত হতে পারেন তাদের হাত থেকে দলীয় রাজনীতি বের করার চেষ্টাও হবে বিভিন্ন উপায়ে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দলীয় এমপিদের উদ্দেশে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অনেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন। এ নিয়ে কলহ-বিবাদ করা যাবে না। তবে বিতর্কিত কিছু এমপিকে এখনো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নিজ এলাকায় গণসংযোগ বাড়াতে বলা হয়েছে।

খুলনা-৬ পাইকগাছা-কয়রার এমপি অ্যাডভোকেট শেখ মো. নূরুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ এ এমপির পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারকে বাড়ি থেকে উৎখাত চেষ্টার। সে জন্য কয়েক ফুট উঁচু দেয়াল তুলে তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উঁচু দেয়ালের নিচ দিয়ে মাটিতে বুক লাগিয়ে এবং গাছ বেয়ে অবরুদ্ধ ওই পরিবারের নারী সদস্যরা আসা যাওয়া করেন। অমানবিক এ বিষয়টি আলোড়ন তুলেছে দেশজুড়ে।

দলীয় নেতারা বলছেন, এ রকম এমপিদের হাতে নৌকা প্রতীক দিলে আগামী নির্বাচনের তরী পার হওয়া সম্ভব হবে না। শুধু খুলনার নুরুল হকই নন; বিতর্কিত এমপির তালিকাও অনেক লম্বা।

গণভবন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি বজলুল হক হারুন, অস্ত্র মামলায় কারাভোগকারী সরকারদলীয় এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, নিজের ছবির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মুখাবয়ব বসিয়ে ছবি বিকৃত করে ব্যানার টাঙানো ও নিজের বক্তব্য প্রচার করা চট্টগ্রামের বন্দর-পতেঙ্গা আসনের এমপি এমএ লতিফ, দলের নেতাকর্মীদের থেকে অনেক দূরে থাকা ঢাকা-১৯ আসনের এমপি ডা. এনামুর রহমান এনাম, খুলনা-১ আসনের এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ননী গোপাল মন্ডল, দলীয় নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে চলা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাছানুর রহমান রিমন, হত্যা মামলার আসামি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সরকারদলীয় এমপি আমানুর রহমান খান রানা, স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের বলয় সৃষ্টি করা খুলনা-৫ আসনের এমপি নারায়ণচন্দ্র চন্দ, দুদকের মামলায় জামিনে থাকা কক্সবাজার-৪ আসনের আবদুর রহমান বদি, দলীয় রাজনীতি নিজের পকেটবন্দি করা এমপি পিরোজপুর-১ আসনের একেএমএ আউয়াল, যশোর-১ আসনের শেখ আফিল উদ্দিন, যশোর-৪ আসনের রণজিৎ কুমার রায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের গোলাম রব্বানী, রাজশাহী-৪ আসনের মো. এনামুল হক, নিজের নির্বাচনী এলকা বালিয়াডাঙ্গীতে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত ঠাকুরগাঁও-২ আসনের এমপি দবিরুল ইসলামসহ দিনাজপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, ঢাকা, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামের এক বা একাধিক আসনে নতুন প্রার্থী আসতে পারে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গত সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও এবার বিএনপি সে দাবি থেকে সরে এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, এবার তারা নির্বাচনে সহায়ক সরকারের দাবি তুলেছে। যদিও নির্বাচনের সহায়ক সরকার বলতে কী বোঝায় তা এখনো খোলাসা করেনি দলটি। কিন্তু আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী।

গত আট বছরে দলটি অবকাঠামোগত এবং পরিসংখ্যানগত দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন করেছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই রয়েছে তাদের সাফল্য। বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিপ্লবে ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ পরিপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলেই অর্থনীতিবিদদের ধারণা। এসব বিষয়কে পুঁজি করেই আগামী নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাচ্ছে শাসক দল। এ জন্য স্বচ্ছ ইমেজ, প্রতিশ্রুতিশীল, কর্মী ও জনবান্ধব নেতা খোঁজা হচ্ছে বিতর্কিত এমপিদের আসনে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ তাদের ২০তম সম্মেলন শেষ করেছে। নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দেশব্যাপী ঘুরে নির্বাচনী আবহ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সাংগঠনিক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানও করছেন। তাই উন্নয়নের সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে নেতাকর্মীদের এমন নিন্দিত কাজগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কঠোরভাবে। পিস্তল উঁচিয়ে ফাঁকা গুলির কারণেই ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ এক ইউনিটের শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। পুনরায় ক্ষমতায় আসতে এবার দলের এমপি মনোনয়নেও সতর্ক হতে হবে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় নিয়মিত তৃণমূলে খোঁজখবর রাখছেন। একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে খোদ প্রধানমন্ত্রীও অনেক সময় যোগাযোগ করেন। দলের জরিপে উঠে এসেছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে ‘তৃণমূল ফ্যাক্টর’। আর এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সামাল দেয়ার কাজ করছেন ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে অভূতপূর্ব উন্নয়নের কারণে আওয়ামী লীগ যতই এগিয়ে থাকুক না কেন, জাতীয় সংসদের প্রতিটি আসনের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে স্থানীয় ইস্যুগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। স্থানীয় পর্যায়ের এমপি-নেতাকর্মীদের বিগত দিনের কর্মকান্ডও ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করবে।

সূত্র-পূর্ব পশ্চিম

পাঠকের মতামত

‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার রাজি থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণ খুঁজতে হবে’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ...