উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১/০৪/২০২৬ ৮:০০ এএম , আপডেট: ২১/০৪/২০২৬ ১২:৫৯ পিএম

পর্যটন শহর কক্সবাজারে তীব্র লোডশেডিং চলছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যন্ত্রণায় স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও হাঁসফাঁস অবস্থা। ব্যাহত হচ্ছে সেচ পাম্প কার্যক্রম। কক্সবাজার জেলার আট উপজেলার চিত্র প্রায় অভিন্ন। জেলা শহরে প্রতিদিন সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। উপজেলাগুলোতে এ সময় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময়ই কক্সবাজারে লোডশেডিং চলায় পর্যটন শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত তিনদিন দিন ধরে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজারে বসবাসকারী প্রায় ২৮ লাখ মানুষের অবস্থা নাকাল। পাশাপাশি অচল হয়ে পড়ছে হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস, চিংড়ি উৎপাদনের হ্যাচারি, বরফকলসহ কয়েক হাজার ক্ষুদ্র শিল্প, পোলট্রি খামার ও প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া গ্রামের অবস্থা হয়ে পড়েছে অনেক বেশি শোচনীয়। রাতের বেলায় শহরের অধিকাংশ এলাকায় থাকছে অন্ধকার। এর ফলে চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই লোডশেডিং থেকে বাঁচতে জেনারেটর ব্যবহার করছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় এবং জেনারেটরের বিরক্তিকর শব্দের কারণে নগরবাসী ও পর্যটকদের মাঝে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামে দৈনিক বিদ্যুৎ থাকছে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘন্টা বা তারও কম।
কক্সবাজার শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার গৃহিনী সুমাইয়া ছিদ্দিকা জানান, বিদ্যুৎ নিয়ে গত তিন দিন ধরে অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময়ই থাকতে হচ্ছে বিদ্যুৎহীন। বিদ্যুৎ নির্ভর জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শহরতলীর লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগ হচ্ছে। শহরে পাঁচ শতাধিক ভবনে এখন অবৈধভাবে দ্বৈত লাইন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছে।

কক্সবাজার পোলট্রি ফার্ম মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার দুই হাজারের বেশি পোলট্রি খামার ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মুখে। লোকসানের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে ১৪ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। মুরগি ও ডিমের দাম আরও বেড়ে যাবে।
কক্সবাজার নাগরিক কমিটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা জানান, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে সাত উপজেলায় দেড় ২৩ লাখ গ্রহকের চরম দুর্ভোগ যাচ্ছে। এখানকার পর্যটন, সেচ, হ্যাচারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে বিপর্যয় নেমে এসেছে।

কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি সমকালকে জানান, পিডিবির অধীনে কক্সবাজারে দৈনিক ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতাল ও বিচার বিভাগসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান লোডশেডিং মুক্ত রাখতে হচ্ছে। এই কারণে স্বল্প বিদ্যুৎ দিয়ে পুরো জেলা সামাল দিতে অত্যন্ত বেগ পেতে হচ্ছে।
কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মকবুল আলম সমকালকে জানান, কক্সবাজারে দৈনিক পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৫০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

চার হাজারের বেশি সেচ পাম্প বন্ধ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে- টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় সেচ পাম্প আছে ৭ হাজার ১৪৬টি। এর মধ্যে ৫-২০ পাওয়ারের (হর্স পাওয়ার) গভীর পাম্প ১০টি, ১-৫ পাওয়ারের শ্যালো পাম্প ৪ হাজার ৮৫২টি এবং ৫-১০ পাওয়ারের এলএলপি (লো লিপ পাম্প) আছে ২ হাজার ২৮৪টি। ৭০ শতাংশ পাম্প ডিজেলচালিত, অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেল উভয় দিয়ে চলে। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। তাতে সেচ কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক কৃষি সমিতির নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, ডিজেল–সংকটের কারণে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি সেচ পাম্প বন্ধ আছে। এর ফলে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ঠিকমতো পানি সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের নয়াপাড়ার কৃষক সাইফুল আলম বলেন, ডিজেল–সংকটের কারণে এক মাস ধরে টানা এক ঘণ্টাও তিনি পাম্প চালাতে পারিনি। এমন অবস্থা আগামী ১০-১২ দিন চলতে থাকলে ধানগাছ মরে যাবে।
জেলায় এবার ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, ২০-২৫ দিন ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।

পাঁচ শতাধিক হোটেল ব্যবসায় ধ্বস
অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে সাগরপাড়ের পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। যেখানে প্রতিদিন পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে দুই মেগাওয়াটেরও কম।
তিনি জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটকরা হোটেলে থাকতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ কারণে চলতি মাসে পর্যটকের আগমনও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এতে সরকারও মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আবুল কাশেম সিকদার জানান, ঘন ঘন
লোডশেডিংয়ের কারণে সৈকতের পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস অন্ধকারে থাকে। একদিকে সংকট অপরদিকে দাম বৃদ্ধির কারণে এসব হোটেলের জেনারেটরে সারা রাত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে দুর্ভোগের শিকার হয়ে পর্যটকেরা ফিরে যাচ্ছেন।

পাঠকের মতামত

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি জনগণের সরকার, সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ...

রাজাপালং ভেঙে হচ্ছে ‘উয়ালাপালং’ ইউনিয়ন, গণশুনানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়ন বিভক্ত করে ‘উয়ালাপালং’ নামে নতুন একটি ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ...

টেকনাফে ইউনিয়ন বিভক্তি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি; নেতৃত্বের দ্বন্ধে বাড়বে জন ভোগান্তি

কক্সবাজারের টেকনাফে নতুনভাবে কয়েকটি ইউনিয়ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাগেছে। নাগরিক সেবা ত্বরান্বিত করতে উপজেলার ...

কক্সবাজারে বন্যা কবলিত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাচ্ছিলেন, পথে প্রাণ গেল বন্ধুর

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মো. মানিক উদ্দিন নাহিদ ...

কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবা পাচার, আটক ৩

মাদক পাচারে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে সন্দেহ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল ...