৩৫ বছরের ঐতিহ্য, তবুও সরকারি নয়

উখিয়া কলেজ জাতীয়করণের জোর দাবি

এম ফেরদৌস, বিশেষ প্রতিবেদক, উখিয়া নিউজ ডটকম
প্রকাশিত: ১৩/০৬/২০২৬ ২:৪৯ পিএম

দক্ষিণ কক্সবাজারের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে আসা কলেজটি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হলেও এখনো সরকারি মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। ফলে কলেজটির জাতীয়করণ এখন উখিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফরকে কেন্দ্র করে উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণের ঘোষণা আসবে। এমন একটি সিদ্ধান্ত সীমান্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম করবে বলে মনে করছেন তারা।

উখিয়া-টেকনাফের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী শাহজাহান চৌধুরীর উদ্যোগে ১৯৯১ সালে প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় উখিয়া কলেজ। শিক্ষা থেকে পিছিয়ে থাকা সীমান্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষার আওতায় আনাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সেই স্বপ্ন থেকেই যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজ দক্ষিণ কক্সবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উখিয়া কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং উখিয়ার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের পথচলায় কলেজটি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছে এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। অনেকে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সিভিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পেশাগত খাতে উখিয়া কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করছেন।

বর্তমানে কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক (সাধারণ ও কারিগরি), ডিগ্রি (পাস) এবং সাতটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। বিষয়গুলো হলো বাংলা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৭০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

শুধু তাই নয়, কলেজ কর্তৃপক্ষ চারটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর কার্যক্রমও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্থানীয়দের মতে, উখিয়া অঞ্চলের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় উখিয়া কলেজের শিক্ষার মান, ফলাফল এবং পাসের হার অত্যন্ত সন্তোষজনক। সরকারি কলেজ হিসেবে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জমি, অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক এবং একাডেমিক কার্যক্রমসহ প্রায় সব ধরনের যোগ্যতাই কলেজটির রয়েছে।

তবে এতসব অর্জন, ঐতিহ্য ও সাফল্যের পরও কলেজটি এখনো জাতীয়করণের আওতায় আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে উখিয়ার সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয়দের অনেকেই উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উখিয়া বঙ্গমাতা মহিলা কলেজ অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয়করণের আওতায় আসে। যদিও সেখানে শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পাঠদান পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে উখিয়া মহিলা কলেজ রাখা হয়। অনেকের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বঙ্গমাতা’ নাম থাকার কারণে কলেজটি জাতীয়করণের সুযোগ পেয়েছিল।

সচেতন মহলের অভিমত, কক্সবাজার জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা বা জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হলেও উখিয়ার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে উপজেলার হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী সরকারি কলেজের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, উখিয়া বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত জনপদ। রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পর্যটন সম্ভাবনা এবং আর্থ-সামাজিক নানা কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে উখিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।

উখিয়া কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহা আলম বলেন, “১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহজাহান চৌধুরীর স্বপ্নের উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। আমাদের পর প্রতিষ্ঠিত অনেক কলেজ বিগত সরকারের আমলে জাতীয়করণ হলেও এই পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী কলেজটি এখনো সরকারি হয়নি। এতে এখানকার ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।

আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, উখিয়া কলেজকে দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক। এই কলেজটি সরকারি হলে সীমান্ত এলাকার অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার আরও বড় সুযোগ পাবে এবং দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।”

উখিয়াবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দাবি ও জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার উখিয়া কলেজকে দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনবে। এতে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে না, বরং সমগ্র সীমান্ত অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ তৈরির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

পাঠকের মতামত

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি জনগণের সরকার, সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ...

রাজাপালং ভেঙে হচ্ছে ‘উয়ালাপালং’ ইউনিয়ন, গণশুনানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়ন বিভক্ত করে ‘উয়ালাপালং’ নামে নতুন একটি ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ...

অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা

সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান ২০২৬ সালের এইচএসসি ...

টেকনাফে ইউনিয়ন বিভক্তি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি; নেতৃত্বের দ্বন্ধে বাড়বে জন ভোগান্তি

কক্সবাজারের টেকনাফে নতুনভাবে কয়েকটি ইউনিয়ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাগেছে। নাগরিক সেবা ত্বরান্বিত করতে উপজেলার ...

কক্সবাজারে বন্যা কবলিত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাচ্ছিলেন, পথে প্রাণ গেল বন্ধুর

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মো. মানিক উদ্দিন নাহিদ ...

কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবা পাচার, আটক ৩

মাদক পাচারে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে সন্দেহ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল ...