

★ ২০০ মিটার ব্যাসার্ধে প্রবেশ নিষিদ্ধ, কাঁটাতারের বেড়া; ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করবে বাপেক্স
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসে লাগা আগুন চার দিনেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জননিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা স্থাপন করা হচ্ছে। এদিকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে অন্তত ১৫ দিন এর প্রবাহ পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ শুরু হয়। একই দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার ১৪৪ ধারা জারি করেন। আদেশ অনুযায়ী, আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না করার পরামর্শ : গ্যাস নির্গমন ও আগুনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার সকালে পেট্রোবাংলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) এর সভাপতিত্বে বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বাপেক্সসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করা বা আগুনের শিখা নেভানোর চেষ্টা করা যাবে না। গ্যাসের প্রবাহপথে বাধা সৃষ্টি করলে ভূগর্ভে গ্যাস জমে উচ্চচাপে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এবং অন্য স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রাথমিকভাবে ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রবাহ না কমলে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরাপত্তার জন্য ঘটনাস্থলকে তিনটি বলয়ে ভাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্গমনস্থল থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে ‘রেড জোন’, ১০০ মিটারকে ‘নো ফায়ার জোন’ এবং ২০০ মিটারকে ‘অবজারভেশন জোন’ হিসেবে নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। রেড জোনে জনসাধারণের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ থাকবে। নো ফায়ার জোনে আগুন জ্বালানোসহ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। অবজারভেশন জোনে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া নো ফায়ার জোনের মধ্যে বৈদ্যুতিক লাইন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি ও ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে বাপেক্স : গত ২৭ অক্টোবর সকালে ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় মাটি খনন করে পাইপ প্রবেশ করানোর একপর্যায়ে ভূগর্ভ থেকে তীব্র বেগে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে তাতে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। ভূগর্ভের ফাটল দিয়ে সেখান থেকে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। তবে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ ছাড়া গ্যাসের প্রকৃতি, উপাদান ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, গ্যাসের নির্গমন বা চাপ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাপেক্সের কারিগরি দল ইতোমধ্যে কয়েক দফা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এর উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে অধিকতর অনুসন্ধান চলছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক : আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে প্রায় চার হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী কাইজার নুর জানান, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বন্ধ রাখা বিদ্যুৎ সরবরাহ বুধবার রাতে পুনরায় চালু করা হয়েছে

পাঠকের মতামত