
জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ (কক্সবাজার)
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে দুই যুগে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ১৮৪টি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট। ইট-কংক্রিটের এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে সরকারের অনুমতি ছাড়াই। এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি প্রশাসন। বরং বলতে গেলে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
আর এর জেরে দ্বীপের কৃষিজমি এক দশকেই কমেছে ৬৫ একর। পরিস্থিতির কারণে দ্বীপবাসী কৃষিবিমুখ হয়ে পড়ছে। দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, পরিবেশগত সংকট তীব্র হলে ১৯৯৯ সালেই সরকার এই দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। ইসিএ এলাকায় পাকা স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার একটি এই সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। তার মানে এই দ্বীপের পানি, মাটি, বায়ু বা প্রাণীর ক্ষতি করে—এমন কোনো কাজ এখানে করা যাবে না।
সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণে ছাড়পত্র দেয় না পরিবেশ অধিদপ্তর। তার পরও ২০০০ সালের পর থেকে দ্বীপে ইট-কংক্রিটের পাকা স্থাপনা নির্মাণ বাড়তেই থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক দশকে দ্বীপে শতাধিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২২ সালে সেন্ট মার্টিনকে মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া ঘোষণা করে সরকার। ঘোষণা অনুযায়ী এখানে ইট-সিমেন্ট আনাও নিষিদ্ধ।
শুধু বাঁশ-কাঠ দিয়ে প্রতিবেশবান্ধব অবকাঠামো করা যেতে পারে। তার পরও তৈরি করা হয়েছে একের পর এক ইট-কংক্রিটের স্থাপনা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দ্বীপে ১৮৭টি হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। এগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। এসব রিসোর্টের বাইরেও দ্বীপে বসতবাড়িতে দুই-তিনটি কক্ষ পর্যটকদের ভাড়া দিয়ে বাড়ির মালিক অর্থ উপার্জন করেন। ১৮৭টি রিসোর্টের তিনটির সরকারি অনুমোদন রয়েছে বলে জানা গেছে। বাকিগুলো নির্মাণ করা হয়েছে সরকারের অনুমোদন ছাড়াই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বীপে প্রায় ১৫০টি রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এর বেশির ভাগই ইট ও কংক্রিটের। দ্বীপবাসী হাবিব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বীপটি সবচেয়ে বেশি পরিবেশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। একদিকে সরকার কাগজে-কলমে নির্দেশনা দিত। অন্যদিকে তাঁদের দলীয় নেতাকর্মীরা ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করেই দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দ্বীপে ২৫টি রিসোর্টের জমির খতিয়ান সৃজন করা হয়নি ও জমির কাগজপত্র যথাযথ অবস্থায় নেই। সেন্ট মার্টিনে এসব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রশাসন নির্মীয়মাণ কয়েকটির নির্মাণকাজ বন্ধ, জরিমানা করাসহ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, পরে সেসব স্থাপনাও পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে।
দ্বীপের বাসিন্দারা জানায়, নব্বইয়ের দশকে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল দ্বীপবাসী। ওই সময়ে দ্বীপের কৃষিজমিতে ধান, পেঁয়াজ, আলু, রসুন, তরমুজ, শসা ইত্যাদি কৃষিপণ্যের ব্যাপক উৎপাদন ছিল। কিন্তু দ্বীপের কৃষিজমিতে হোটেল, রিসোর্ট নির্মাণ হওয়ার পর কৃষিজমি কমছে। দ্বীপের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, একসময় সেন্ট মার্টিনের বেশির ভাগ মানুষের সারা বছরের খাদ্য মজুদ থাকত। সাগরের মাছ শিকারের সুযোগ ছিল। কোনো অভাব ছিল না। বর্ষা মৌসুমে টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো খাদ্যসংকট থাকত না। এখন বছরের বেশির ভাগ সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকে, কৃষিকাজ নেই বললেই চলে। কয়েক দিন টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকলে দ্বীপে খাদ্যসংকট দেখা দেয়।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন, দ্বীপে আমরা অবশ্যই ট্যুরিজম চাই। তবে সেটি হতে হবে পরিবেশবান্ধব। ইট-কংক্রিটের যেকোনো স্থাপনার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। কাতারপ্রবাসী ও ইতিহাসবিদ ডক্টর হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সেন্ট মার্টিনে যেসব হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট রয়েছে তাতে দ্বীপের মানুষ আসলে কতটা লাভবান হচ্ছে, তা দেখতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ রিসোর্ট মালিক বহিরাগত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এই দ্বীপে পর্যটকদের জন্য যত রিসোর্ট করা হবে তার সবই হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও দ্বীপের বাসিন্দাদের মালিকানায়। অনেক দেশের পর্যটন এলাকায় স্থানীয়রা তাঁদের নিজেদের বসতবাড়িতে ঘরের পাশেই দুই তিনটি অতিরিক্ত কক্ষ তৈরি করে পর্যটকদের ভাড়া দেন। তাঁরা পর্যটকদের খাবারদাবারের ব্যবস্থাও করেন। এই পদ্ধতি সেন্ট মার্টিনে চালু করা যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দীন বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই সেন্ট মার্টিনে যেসব স্থাপনা করা হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সেন্ট মার্টিনে প্রায় ২০০টির মতো রিসোর্ট আছে। বেশির ভাগ রিসোর্টই অনুমোদনহীন। অনুমোদনহীন এসব রিসোর্টের মালিকদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আপাতত দ্বীপে নতুন করে কোনো স্থাপনার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রয়েছে।
সুত্র,কালের কন্ঠ


পাঠকের মতামত