প্রকাশিত: ০৯/০৩/২০১৭ ৮:৪৭ এএম

আবু তাহের, কক্সবাজার:
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলছে জঙ্গি তৎপরতা। রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবগঠিত ‘আকামুল মুজাহেদীন’-এর (এএমএম) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুই শতাধিক জঙ্গি টেকনাফের নয়াপাড়া ও লেদা এবং উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করে সশস্ত্র জঙ্গি গ্রুপকে সংগঠিত করছে।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি এনজিওর মাধ্যমে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা। এই টাকার বড় অংশ ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করছে জঙ্গি নেতারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এর পর সংস্থাগুলোও তৎপর হয়ে ওঠে। তাদের অভিযানে আটক হয়েছে কয়েক জন।

কুতুপালং থেকে আটক শীর্ষ ৪ জঙ্গি

নয়াপাড়া ক্যাম্প সংলগ্ন আনসার ব্যারাকে হামলা ও অস্ত্র লুটের অন্যতম হোতা রোহিঙ্গা জঙ্গি গ্রুপের তিন সদস্য খাইরুল আমিন, মাস্টার আবুল কালাম আজাদ ও হাসান আহমদকে গত ৯ জানুয়ারি কুতুপালং ক্যাম্প থেকে আটক করে র‌্যাব। তাদের নিয়ে র‌্যাব সদস্যরা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু পুরানপাড়ার গহীন অরণ্যে অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ধরনের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২১৫ রাউন্ড গুলি। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে পাঁচটি গত বছরের ১২ মে নয়াপাড়া আনসার ব্যারাক থেকে লুট হয়েছিল বলে শনাক্ত করেন আনসার ভিডিপির মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার কুতুপালং ক্যাম্প থেকে আটক হয়েছে আরেক শীর্ষ জঙ্গি নুর আলম। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আনসার ক্যাম্পের বাকি ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার গহীন পাহাড়ি এলাকা থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। আটক ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে, তারা সবাই ‘এএমএম’-এর সদস্য।

কক্সবাজারস্থ র‌্যাব-৭ এর কোম্পানি কমান্ডার আশেকুর রহমান জানান, ‘আমাদের কাছে খবর ছিল_ টেকনাফের লেদা আনসার ক্যাম্পে হামলার মূল হোতা রোহিঙ্গা জঙ্গি নুর আলমসহ কয়েকজন কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করছে। খবর পেয়ে র‌্যাবের একটি টিম রাতে অভিযান চালায়। তিনি আরও জানান, আটক নুর আলমের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা আনসার ব্যারাকে হামলা চালিয়ে ক্যাম্প কমান্ডার আলি হোসেনকে হত্যা করে। লুট করে নিয়ে যায় ১১টি অস্ত্রসহ ৬৭০ রাউন্ড গুলি। লুণ্ঠিত সব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আটক হয়েছে এর সঙ্গে জড়িত ৬ জঙ্গি।

র‌্যাব কমান্ডার জানান, উখিয়া ও টেকনাফের ৩টি ক্যাম্পে ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এখানে সন্ত্রাসী জঙ্গিরা সহজে আত্মগোপন করে থাকতে পারে। এ ছাড়া ক্যাম্পগুলোর কাছেই রয়েছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। ফলে আস্তানা গড়ে অবস্থান করার সুযোগ রয়েছে। এখান থেকেই আনসার ব্যারাকে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ক্যাম্পে হচ্ছে নিয়মিত গোপন বৈঠক

কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১৩ হাজার। অথচ সেখানে তালিকা বহির্ভূত দেড় লাখের বেশি

রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের ওপর সরকারি কোনো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা গোপনে নিয়মিত বৈঠক করছে এবং দেশি-বিদেশি তহবিল সংগ্রহ করছে।

নতুন জঙ্গি গ্রুপ এএমএম

মিয়ানমারের রাখাইন

রাজ্যের মংডুতে গত ৯ অক্টোবর পুলিশ বাহিনীর ৪টি ক্যাম্পে একসঙ্গে হামলা চালিয়ে শক্তির কথা জানান দেয় আকামুল মুজাহেদীন (এএমএম)। পুলিশের ৯ সদস্যকে হত্যা করে ৬৩টি অস্ত্র লুট করে এএমএম। ইন্টারনেটে ভিডিও আপলোড করে এই হামলার দায় স্বীকার করে সংগঠনটি। এর পর রোহিঙ্গা জঙ্গিদের ধরতে অভিযানে নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা রোহিঙ্গাদের অন্তত ২০ গ্রামে আগুন দিয়েছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে বাড়িঘর, গোলার ধান, ক্ষেতের ফসল। নির্বিচারে হত্যা করেছে পাঁচ শতাধিক নিরীহ ব্যক্তিকে। ধর্ষিত হয়েছে অনেক নারী-শিশু। ফলে দলে দলে রোহিঙ্গারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসে। সেনাবাহিনীর অভিযানে টিকতে না পেরে শতাধিক জঙ্গি কুতুপালং ও লেদা ক্যাম্পে আত্মগোপনে রয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ বলেন, রোহিঙ্গাদের দুরবস্থার চিত্র বহির্বিশ্বে প্রচার করে বিপুল টাকা নিচ্ছে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা। মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্কভিত্তিক কিছু এনজিও তাদের সহযোগিতা দিচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান, তুরস্কের ইনসামা ইয়ারদিনলাফ তার্কিয়া, ডিয়ানাত ফাউন্ডেশন, কুয়েতের আবরুল্লাহ আল নূরী চ্যারিটি ফান্ড, মুয়ালি্লম আল জামিল, আরব আমিরাতের শারজাহ চ্যারিটি ফান্ড, আবদুর রহমান মোহাম্মদ আত্ তামিমীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকে মোটা অংকের অনুদান ও ত্রাণ নিয়ে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা আত্মসাৎ করেছে।

বিআরআরএইচ ও ইত্তেহাদুল জামিয়া’র তৎপরতা

স্থানীয় সূত্রমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোপনে ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে ভয়েস অব রোহিঙ্গা রিফিউজি ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল ইসলাম নামে আরও দুটি সংগঠন। মঙ্গলবার রাতে ৯শ’ রোহিঙ্গা পরিবারের মাঝে নগদ টাকা বিতরণ করেছে এ দুটি সংগঠনের কর্মকর্তারা। এরা জঙ্গি কর্মকাণ্ডেও গোপনে ভূমিকা রাখছে। সূত্র জানায়, এ দুই সংগঠনের সঙ্গে রয়েছেন আরএসওর সাবেক কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে রয়েছেন মৌলভী জানে আলম, মৌলভী হামিদ, মৌলভী আইয়ুব, মৌলভী শফি, ডাক্তার ওসমান, নুরুল আমিন মাঝি, মোহাম্মদ নুর, আবু সিদ্দিক, মৌলভী মনজুর, হাফেজ আতা উল্লাহ, নুরুল আলমসহ আরও কয়েকজন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল হক টুটুল বলেন, জঙ্গিদের বিষয়ে সরকার ও প্রশাসন জিরো টলারেন্সে রয়েছে। ক্যাম্পভিত্তিক সব কর্মকাণ্ড তদারক করতে স্থানীয় থানাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, বিদেশি এনজিওর ব্যাপারে সতর্ক রয়েছি। যে কেউ চাইলে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে পারে না। প্রশাসনের মাধ্যমে করতে হবে। তিনি বলেন, রাতের আঁধারে কারা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুত্র: দৈনিক সমকাল

পাঠকের মতামত