
হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার) :
স্বামী তাবলিক জামাতে। স্ত্রী তখন জোহরের নামাজে দাড়িঁয়ে। ঠিক ঐ সময়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে রোহিঙ্গাদের হাজারো ঘর। সালাম ফিরিয়ে স্বামীকে ফোন দেয় স্ত্রী। ক্যাম্পে আগুন লেগেছে। আমি নামাজে। আমার চার পাশে পুড়ে ঘরগুলো ছাই হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন কী করবো? বাড়িতে আমি একা। তুমিও নাই। অপর প্রান্তে মোবাইলে নির্দেশনা দেয় স্ত্রীকে।
স্বামী বলেন, যার কেউ নেই, তার সাথে আল্লাহ আছে। আমি দ্বীনের কাজে বাহিরে আর তুমি আল্লাহর নির্দেশ পালনে ফরজ নামাজ পড়ছো। তুমি নামাজ ছাড়বে না। জায়নামাজে বসে আল্লাহকে ডাকো। তিনি সব কিছু পারেন। একা কোথাও বাহিরে যাবে না। আল্লাহ রক্ষা করবেন।
এই কথা বলে স্বামী মোবাইল কেটে দেন। স্ত্রী স্বামীর নির্দেশ মতো জায়নামাজে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন এবং এই মহা বিপদ থেকে বাঁচতে উপরওয়ালার সাহাস্য চাইলেন।
আল্লাহর কুদরত ঐ ঘরের আশপাশ ততক্ষণে পুড়ে শেষ হয়ে গেলেও অক্ষত রয়ে যায় সেই রোহিঙ্গার ঘরটি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত যারাই এই খবর শুনেছে তারা ঐ ঘরটি দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ নুর ও তার স্ত্রী উম্মে কুলসুমা এসব কথা জানান। কৌতুহলি মানুষ ঐ মহিলা ও ঘরটি এক নজর দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই তাকে হাদিয়া স্বরুপ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিচ্ছেন।
সরেজমিন ঘটনাস্থল ৯ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে জানা যায়, উক্ত ঘরে অবস্থানরত মহিলার স্বামী কারো সাথে কথা বলতে ও ছবি তোলতে স্ত্রীকে বারন করেছেন। যার ফলে মহিলার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। জিয়াবুর রহমান বলেন, আমরা কোন দিন ঐ মহিলাকে ঘর থেকে বের হতে দেখিনি। প্রয়োজনে স্বামীকে সাথে নিয়ে হাতে পায়ে মোজা পরে বোরকা পরিহিত অবস্থায় স্বামীর সাথে বের হন।
তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু পর্দানশীল মহিলা। তার স্বামী দ্বীনের খেতমতে জামায়াতে তবলিগের কাজে সব সময় ব্যস্থ থাকেন।
রোহিঙ্গা নারী নুর কায়দা জানান, আমরা অনেকের সাথে কথা বলি, তবে পর্দা মেনে চলি। মনে রাখতে হবে আমরা মুসলমান। রোহিঙ্গা নারীরা যে পর্দানশীল তা ঐ মহিলায় জলন্ত উদাহরণ।আল্লাহর রহমত ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না।
রোহিঙ্গা যুবক শেখ আনসার আলী বলেন, ৯ নং ক্যাম্পের আগুনের লেলিহান শিখা ও বাতাসের তীব্র গতিতে মুহুর্তেই ঘরগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। আগুন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লেও বাতাস তার গতি ফিরিয়ে অন্যদিকে মোড় নেয়। ঘরটি থাকে অক্ষত। এ এক আশ্চর্য বিষয়। এতে নিশ্চয় আমাদের জন্যে শিক্ষা রয়েছে।
আগুনে পুড়ে অনেক রোহিঙ্গার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। এখন রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ-উৎকন্টা বেড়েছে। এখনো সবাই তাদের ঘরে ফিরতে পারেনি।
আরেক রোহিঙ্গা হাসান ও মৌলবি ছলিম জানান, আমরা রোহিঙ্গাদের ইতিহাস চরম নৃশংসতার ইতিহাস। মিয়ানমার জান্তার চরম অত্যাচারে এই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের ভয়াল কালরাত পেরিয়ে, ছাই-ভস্ম মাড়িয়ে মাথা গোছার একমাত্র কুড়ে ঘরে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে বসবাস করছিল। বারংবার আমাদের বিপদ আসে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারি না।

পাঠকের মতামত