
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দেশের মূল স্রোতে একীভূত করতে বিশ্বব্যাংক যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা প্রত্যাখ্যান অর্থাৎ নাকচ করে দিয়েছে ঢাকা। সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এদিকে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে জেনে কক্সবাজারে সোমবার স্থানীয়রা মসজিদে মসজিদে প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য দোয়া করিয়েছেন।
২ আগস্ট রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আমরা যে রোহিঙ্গাদের রেখেছি, তারা আমাদের সংজ্ঞাতে শরণার্থী না। তারা হচ্ছে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণ, আমরা কিছুদিনের জন্য তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে তারা ফিরে যাবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারও বলেছে, তাদেরকে নিয়ে যাবে। চার বছর হলো যায় নাই, তারা কিন্তু কখনো বলে নাই, নিবে না। সুতরাং, এরা সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া লোক। এখানে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। তারা শরণার্থী না।
শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবসহ ’রিফিউজি পলিসি রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে ১৬টি দেশের শরণার্থী ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিশ্ব ব্যাংক।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয় থেকে ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে মতামত চেয়ে জুনের ৩০ তারিখ অর্থমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেদনে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, কাজ করা, চলাফেরা, জমি কেনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হওয়াসহ সব ধরনের আইনি অধিকার শরণার্থীদের দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এই রিপোর্টটা- যেহেতু প্রথমত এরা (রোহিঙ্গারা) শরণার্থী না- আমরা পুরোপুরি রিজেক্ট করেছি।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক যে প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদি। আমরা এটার পক্ষে না। আমরা আমাদের বক্তব্য জানিয়েছি। বলেছি, আমরা এটা গ্রহণ করি না। আমরা নাকচ করার পর ওদের সঙ্গে একটা সমঝোতা হচ্ছে। যেগুলো আমরা অপছন্দ করি সেগুলো বাদ দিয়ে একটা চুক্তি করব। আমাদের যে ক্ষণস্থায়ী চিন্তাভাবনা, সেটা অনুযায়ী তারা রাজি হলে চুক্তি করব।’
বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটা বাড়তি চাপ থাকবে বলেও মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
UN chief hears 'heartbreaking accounts' of suffering from Rohingya refugees in Bangladesh; urges international community to 'step up support' | | UN News
উল্লেখ্য, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে এসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় রয়েছে। সরকার মানবিক কারণে এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আশ্রয় দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা ৭ লাখ। সরকারের হিসাবে ১১ লাখের বেশি। অপরদিকে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর এবং এর আরও আগে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এতবছর পর (১ আগস্ট) বিশ্বব্যাংক বলেছে, ওরা রিফিউজি। বাংলাদেশ বলেছে, রোহিঙ্গারা রিফিউজি নয়। ওরা মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়ার যে ঢল নামে। ওরা ৪ বছরেও যায়নি। মিয়ানমার তাদের নেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু এখনও প্রত্যাবাসনের ধারেকাছে নেই।
এদিকে ‘ঋণ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কক্সবাজারের শরনার্থী শিবিরে আশ্যয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির’ বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব কোনওভাবেই সমর্থন যোগ্য নয় বলে জানিয়েছে জেলার বিশিষ্ঠজনরা। তাদের দাবি, বিশ্বব্যাংকের এ ধরনের প্রস্তাব মেনে না নিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বলেন, ‘বাংলাদেশকে নতুন ফিলিস্তিন বানানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া এই ধরনের পরামর্শের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তিগুলোকে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে।’ ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে মিয়ামনারে ফেরত পাঠানো। এ ধরনের প্রস্তাবের মাধ্যামে বিশ্বব্যাংক মূলত রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করছে। কারণ সম্মানজনকভাবে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়াটাই হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে সমর্থন দিলে তাদের সেই অধিকার ব্যাহত হবে।’
I visited the Rohingya camps in Myanmar and here is what I saw
কক্সবাজার বাচাঁও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন,‘বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব গৃহীত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে বাধ্য। ‘এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে এ ব্যাপারে সরকারকে তার অবস্থান দ্রুত সুস্পষ্ট করতে হবে এবং দেশের ভেতরও জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
উখিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটা দেশের জন্য একটি শুভ দিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার খাতিরে রোহিঙ্গাদের জায়গা দিয়েছেন, তখন আশ্রয় না দিলে জাতিসংঘ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের দুর্নাম করত। মানবতার খাতিরে আশ্রয় দেয়া হয়েছে বলেই কি তাদের স্থায়ী করে নিতে হবে? এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলব, আপনি বিশ্ব ব্যাংকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। সুন্দর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করুন। আপনার আহ্বানে প্রয়োজনে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়ে হেঁটে ঢাকায় এসে বিশ্ব ব্যাংকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করতে প্রস্তুত। বিশ্ব ব্যাংকের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করা হয়েছে জানিয়ে টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ফজলুল কবির সোমবার সন্ধ্যায় জানান, রোহিঙ্গাদের কীভাবে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে একীভূত করার কথা তারা বলতে পারে? বিশ্ব ব্যাংক যদি বাংলাদেশকে ভিক্ষুক মনে করে তা তাদের ভুল হবে। যেহেতু আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। বাংলাদেশ স্বনির্ভর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশরক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত রয়েছে এদেশের জনগণ।

পাঠকের মতামত