প্রকাশিত: ২৬/০৩/২০১৮ ৭:৪৮ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ৪:৫৮ এএম

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ ::

দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ রফিকুল আলমের মামলার অগ্রগতি হয়নি। আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। সবুজ বনায়ন রক্ষায় ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ যুবক রফিক বন দস্যুদর ছুরিকাঘাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। ১০ বছরেও এ হত্যা মামলার বিচার হয়নি। টেকনাফের বাহারছড়ার রফিকুল আলমই দেশের প্রথম নিসর্গ শহীদ। এমনকি ২৩ মার্চ রফিকের স্মরণে ‘সহ-ব্যবস্থাপনা দিবস’ পালনের জন্য ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ সরকারের নিকট প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। যা এখনো বিবেচনাধীন। বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

সরেজমিন শীলখালী সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি সাইফুল্লাহ কোম্পানীসহ রফিকের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারী রফিকুল আলমের জন্ম টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুরানপাড়া গ্রামে। বাবা নুর আহমদ আর মা নুরুচ্ছফা বেগমের ঘরে ৩ মেয়ে এবং ২ ছেলের মধ্যে রফিক সবার বড়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিক খেয়ে না খেয়েই বড় হন। মক্তবের লেখাপড়া শেষ করে স্থানীয় শামলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর পরিবারের আর্থিক অসঙ্গতির কারণে আর লেখাপড়া করতে পারেননি। প্রথমেই তিনি বাবার সঙ্গে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। পরে মৎস্য শ্রমিক হয়ে অভাবের সংসারে ঘানি টানতে শুরু করেন। ২০০৫ সালে বন বিভাগের নিসর্গ কর্মসূচি চালু হয়। ২০০৬ সালের ১৫ অক্টোবর নিসর্গ বন পাহারাদলে যোগ দেন রফিক। বন পাহারা দলে যোগ দিয়ে ভালো কাজের জন্য শীলখালী আকাশমণি ৪২ জনের নিসর্গ বন পাহারা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।

রফিকুল আলমের পিতা নুর আহমদ বলেন ‘রফিক হত্যা ঘটনার পর আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে দস্তখত নিয়ে বলা হয়েছিল সরকার মামলা পরিচালনা করবে। এরপর আমরা আর মামলার বিষয়ে কোন খোঁজ রাখিনি। আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে’।

মা নুরুচ্ছফা বেগম রফিকের ছবি সম্বলিত প্লাকার্ড বুকে জড়িয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন ‘মামলার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানিনা। রফিক নিহত হওয়ার ৩ বছর পর তার স্ত্রী জাহেদা বেগম নিকটস্থ হলবনিয়া গ্রামের শফিউল আলম নামে এক যুবককে বিয়ে করে পিত্রালয়ে চলে গিয়েছে। ২য় ঘরে ২ পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। প্রথম সন্তান মোঃ সাইমুন, বয়স ৫ বছর। ২য় সন্তানের নাম ইমান হোছন ইমন। জন্ম নিয়েছে ১৬ মার্চ। রফিকের ঘরে মিতা নুর পাখি ও উমেছ আক্তার রুমা নামে ২ মেয়ে ছিল। সরকারী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রফিক খুন হয়েছে। আমরা চাই রফিকের ২ মেয়ের লেখাপড়া, বিয়েসহ যাবতীয় দায়িত্ব ভার গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড গঠন এবং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত সরকার বহন করুক’।

শীলখালী সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি সাইফুল্লাহ কোম্পানী ও বর্তমান সহ-সভাপতি তহুরা জয়নব বেবী বলেন ‘২৩ মার্চ রফিকের স্মরণে ‘সহ-ব্যবস্থাপনা দিবস’ পালনের জন্য ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ সরকারের নিকট স্মারকযুক্ত প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বন বিভাগের নিসর্গ সহায়তা প্রকল্পের লড়াকু সৈনিক রফিকের আত্মদানকে স্মরণ করে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রতি বছর সারা দেশের ৩৪টি সিএমসিতে বেসরকারীভাবে ২৩ মার্চ পালন করা হয় ‘সহ-ব্যবস্থাপনা দিবস’। এবারে টেকনাফ উপজেলায় পালন করা হয়েছে ২৪ মার্চ। নিসর্গের পর আইপেক কাজ করেছে। বর্তমানে করছে ক্রেল। নিহত রফিকের ২ মেয়ের নামে ২ একর বন ভুমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে’।

রফিকের ঘরে মিতা নুর পাখি ও উমেছ আক্তার রুমা নামে ২ মেয়ে রয়েছে। মিতা নুর পাখি শামলাপুর হাইস্কুলে ৬ষ্ট শ্রেনীতে এবং উমেছ আক্তার রুমা শামলাপুর সরকারী প্রাইমারী স্কুলে ৫ম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত। স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ জানান, সম্পুর্ণ বিনা খরচে তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রনজিত কুমার বড়–য়া বলেন ‘আমি যতদুর জানি মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে’।

এদিকে ২৪ মার্চ শনিবার প্রকৃতি রক্ষায় দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ রফিকুল আলমের আতœ ত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মামলার দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দাবি করে টেকনাফে সহ-ব্যবস্থাপনা দিবস পালিত হয়েছে। ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের সহযোগিতায় সহ-ব্যবস্থাপনা সংগঠন সমুহ এ কর্মসুচীর আয়োজন করে। এবারে প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিপন্ন প্রজাতি রক্ষায় সহ-ব্যবস্থাপনা’। কর্মসুচীর মধ্যে ছিল আলোচনা সভা ও দুয়া।

জানা যায়, সহ-ব্যবস্থাপনা দিবস পালন উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা টেকনাফ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ২৪ মার্চ সকাল ১১টায় অনুষ্টিত হয়। অনুষ্টানে সভাপতিত্ব করেন টেকনাফ সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ শফিক মিয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ রবিউল হাসান। সহ-ব্যবস্থাপনা দিবসের দাবি সম্বলিত মুল নিবন্ধ তুলে ধরেন ক্রেল প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার বশির আহমদ। উপজেলা সমবায় অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম, মহিলা বিষয়ক অফিসার মোঃ আলমগীর কবির, একাডেমিক সুপারভাইজার মোঃ নুরুল আবসার, রইক্ষং বিট অফিসার মঈন উদ্দিন আহমদ, শীলখালী রেঞ্জ অফিসার মঈনুল ইসলাম, ক্রেল প্রকল্পের মুজাহিদ ইবনে হাবিব, সিপিজি সদস্য ইমাম হোসেন বক্তব্য রাখেন। সভায় বক্তাগণ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বন রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সভা শেষে দেশের প্রথম ‘নিসর্গ শহীদ’ রফিকুল আলমের আতœার মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত করা হয়।

পাঠকের মতামত

বান্দরবানে কেএনএফের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযান, নিহত ৩

বান্দরবানের রুমা উপজেলার রনিন পাড়ার কাছে ডেবাছড়া এলাকায় কেএনএফের একটি আস্তানায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ...