ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৩১/০১/২০২৩ ৯:২৯ এএম

দুই বছর আগে পরিবারের অগোচরে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন আহমাদ। ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে তার নাম ছিল ‘রতন দাশ’। তবে ধর্ম পরিবর্তনের পর থেকে নিয়মিত নামাজ-রোজা পালনের পাশাপাশি মুখে দাঁড়ি রাখাও শুরু করেন আহমাদ। পরিবারের আড়ালে ইসলাম ধর্মের সব রীতিনীতি মেনে চলতো। এছাড়া বিভিন্ন হুজুরের সঙ্গে দেখা করতেন আর তাদের বয়ানও শুনতেন।
তবে এতো সবকিছু ঠিকভাবে পালন করে এলেও রবিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর লাশ হস্তান্তরের সময় সামনে আসে কোন ধর্মীয় রীতিতে তার দাফন হবে বিষয়টি।

আহমাদ ওরফে রতন দাশের পরিবারের দাবি— তাদের সন্তান মুসলমান হননি। বন্ধুরা এসব সাজিয়েছে। ভুয়া কাগজ দেখিয়ে তারা তাদের ছেলেকে আলাদা করছে। তাই তাদের ছেলেকে সনাতন ধর্মের রীতিতেই শেষকৃত্য করবে।

এদিকে বন্ধুরা জানায়— দুই বছর আগেই হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন আহমাদ। তাই তাকে ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী দাফন করবে।

এদিকে লাশ হস্তান্তর নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় ওই যুবকের মা পটিয়া থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আজ সোমবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে পটিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের বিচারক বিশ্বেস্বর সিংহ জানিয়েছেন, নিহত ওই যুবকের ধর্ম পরিচয় শনাক্ত হয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাশটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) হাসপাতালের হিমঘরে থাকবে। আর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের রায়ের পর কথা হয় নিহত যুবকের মা সন্ধ্যা রানী দাশের সঙ্গে। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘না, আমি কিছু জানি না। আমার ছেলে ধর্ম পরিবর্তন হওয়ার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কালকে সকালেও আমার ছেলে ঘরে পূজা দিয়েছে। পরশু দিনও আমার ছেলে পূজা দিয়েছিল। আমার ছেলে মুসলিম হওয়ার বিষয়টি তারা (বন্ধুরা) সাজিয়েছে।’

মুখে দাঁড়ি থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। আমি তাকে বিয়ের কথা বলেছিলাম। সে বলেছিল, যতদিন সে প্রতিষ্ঠিত হবে না ততদিন দাঁড়ি কাটবে না। আর যতদিন প্রতিষ্ঠিত হবে না; ততদনি বিয়েও করবে না। আমি দাঁড়ি ফেলবো না।’

এদিকে বন্ধুরা জানিয়েছেন, আহমাদ মুসলমান হওয়ার পর থেকে ইসলামে ধর্মের রীতিনীতি অনুসরণ করতো এবং সবকিছু মেনে চলতো। এরপর থেকে সে কোনো পূজামণ্ডপেও যেত না। আহমাদ প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তো; আর সে বের হলে তার মা জানতো। এছাড়া মসজিদ থেকে জুতা চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তার মাকে সে জানিয়েছিল।

শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় তিনি জানতেন কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে আহমাদের মা সন্ধ্যা রানী দাশ সিভয়েসকে বলেন, ‘না, আমি কখনও দেখিনি। গত শুক্রবারও আমার ছেলে বিকেল ৪টা বাজে ঘুম থেকে ওঠেছে। এর আগের শুক্রবারও বিকেল ৫টার দিকে ঘুম থেকে ওঠছে। এরপর তার বন্ধুরা তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। আমার ছেলেকে তারা (বন্ধুরা) ফোনে বিরক্ত করতো। ওদের ফোনের জন্য আমার ছেলে ঘুমাতে পারতো না।’

মসজিদ থেকে জুতো চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতেন কিনা— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘না, সেই জুতো চুরির বিষয়টি মসজিদে না। আমার ছেলে একটি গার্মেন্টসে কাজ করতো। সেখানে তার জুতো চুরি হয়েছে। সেই বিষয়টি সে আমাকে বলেছে।’

আহমাদ ওরফে রতন দাশের চার বছর বয়সের সময় থেকে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন মা সন্ধ্যা রানী দাশ। এসময় মাসিক ৩শ’ টাকা বেতনে চাকরি করে ৫০ টাকা দিয়ে ছেলের জন্য শিক্ষক রেখেছেন। ছেলেকে এতবড় করেছেন গার্মেন্টসে চাকরি করেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তার যখন ৪ বছর বয়স। তখন থেকে আমি গার্মেন্টসে কাজ করতাম। মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৩শ’ টাকা। সে টাকার মধ্যে ছেলের জন্য ৫০ টাকা খরচ করতাম তার পড়ালেখার জন্য। এখনও আমি গার্মেন্টসে কাজ করি।’

আদালত রায়ের কথা সম্পর্ক জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালত কি রায় দিবে জানি না। আপাতত এখন আমার ছেলের লাশ চমেকের হাসপাতালের হিমঘরে রাখতে বলেছে। কিন্তু আমি চাই— আমার ছেলের লাশ আমার কাছে হস্তান্তর করুক। এবং আমার ছেলে শেষকৃত্য আমাদের ধর্মের রীতিতেই হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের লাশ যদি আমাকে হস্তান্তর না করে তাহলে তার বন্ধুদের কাছেও হস্তান্তর করতে পারবে না। আমি যদি আমার ছেলের লাশ না পাই, তাহলে তার বন্ধুরাও পাবে না। তার লাশ দরকার হলে নদীতে ভাসিয়ে দিবে। তারপরও আমি আমার ছেলের লাশ তার বন্ধুদের কাছে হস্তান্তর করুক সেটা চাই না।’

অপরদিকে আহমাদ ওরফে রতন দাশের বন্ধুরা জানিয়েছেন, তারা বন্ধুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সব প্রমাণ রয়েছে। এসব কাগজপত্র আদালতের সামনে উপস্থাপন করে ইসলাম ধর্মীয় রীতিতে বন্ধু আহমাদকে দাফন করবেন। তবে অবশ্যই সেটা কখন নিষ্পত্তি হবে সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নন।

এদিকে আহমাদ পুরোপুরিভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিয়মিত তা পালন করতেন বলে জানিয়েছেন এডভোকেট সাইফুল ইসলাম। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘আহমাদ দুই বছর আগে কওমী আকিদার এক মাওলানার কাছে কালেমা পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে আমার কাছে আসেন এফিডেভিট (হলফনামা) করতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জানামতে, আহমাদ ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী চলতো। তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েই ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’

এডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আজ আদালত এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন। আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত আহমাদের লাশ চমেকের হিমঘরে থাকবে। পটিয়া থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আদেশ দিয়েছেন এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। এরপরই সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটিয়া থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আনিছুর রহমান সিভয়েসকে বলেন, ‘আদালত রায় দিয়েছেন আপাতত লাশ চমেক হাসপাতালের হিমঘরে রাখার জন্য।’ এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনে দেওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি শুধু জানি লাশ আপাতত হাসপাতালের হিমঘরে থাকবে।’

উল্লেখ্য, রবিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের পটিয়া বাদামতল মোড়ে তেলবাহী লরির চাপায় পিষ্ট হয়ে মোটরসাইকেল আরোহী আহমাদ ওরফে রতন দাশের মৃত্যু হয়। এসময় হাসান নামে তার এক সহকর্মীও আহত হয়েছেন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

এরপর থেকে তার লাশ দাফন নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বন্ধুদের। বন্ধুদের দাবি— দুই বছর আগে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন আহমাদ। ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে তার নাম ছিল ‘রতন দাশ’। তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এটা ওনাদের ছেলে। তাই তাদের ধর্ম রীতিতে তার শেষকৃত্য করবে। ধর্মান্তরিত হওয়ার ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না।

অন্যদিকে বন্ধুরা চান— সে যেহেতু মারা যাওয়ার আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে; সেহেতু তাকে মুসলিম রীতিতেই দাফন করা হবে।

নিহত আহমাদ চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার আবু তোরাব বাজার এলাকার মৃত মনো দাশের ছেলে। বর্তমানে মায়ের সঙ্গে নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২০ সালে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি বন্ধুদের বলেছিলেন, তার মৃত্যুর পর যেন তাকে ইসলাম ধর্মের রীতিতে লাশ দাফন করা হয়।

এদিকে পটিয়া-ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) স্নেহাংশু বিকাশ সরকার সিভয়েসকে বলেছিলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুনলাম তিনি ধর্ম পরিবর্তন করেছেন। তবে এই বিষয়টি তার পরিবার জানতেন না। তাই পরিবারের দাবি— হিন্দুরীতি তাঁর শেষকৃত্য করবে। আর বন্ধুরা চান— সে যেহেতু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তাই তাকে ইসলাম ধর্মের নিয়ম মেনেই দাফন করবে।’

ওই যুবক মুসলিম হওয়ার এফিডেভিট (হলফনামা) থাকার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘সেটার এখনও সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেরকম কোনো ডকুমেন্ট নেই। এফিডেভিট তো আদালতে যায়নি। শুধু নোটারি পাবলিকের কাছে গেছে। নোটারি পাবলিকের সঙ্গে কথা হয়েছে; জানালো— তারা (আহমাদ) আদালতে যাওয়ার কথা ছিল; যায়নি। আদালতে না গেলে তো এফিডেবিট হয় না।

পাঠকের মতামত

বরেণ্য আলেম মাওলানা লুৎফর রহমান ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত

দেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন ও মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা লুৎফর রহমান ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে ...