ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৫/০৮/২০২৬ ৯:৩৭ এএম

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে রয়েছে অনেক ঘাট। অরক্ষিত এই ঘাটগুলোকে কেন্দ্র করে বেড়েছে মানব পাচার ও অপহরণের ঘটনা। দিনে পর্যটকদের কাছে নান্দনিক এই উপকূল রাত নামলেই পরিণত হয় সংঘবদ্ধ অপরাধের নিরাপদ রুটে। প্রলোভনের পাশাপাশি অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও এই উপকূল দিয়ে সাগরপথে পাচারের অভিযোগ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাহাড়ি এলাকায় নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পুলিশের তথ্য মতে, অপহরণ ও মানব পাচার এখন একই সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব চক্র প্রলোভন, জিম্মি ও অপহরণের মাধ্যমে মানুষকে সাগরপথে বিদেশে পাচার করছে। হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর ও শাহপরীর দ্বীপ বর্তমানে এ অপরাধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।
সম্প্রতি কক্সবাজারে এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, টেকনাফে ক্রমবর্ধমান অপহরণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অপহরণপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে পর্যায়ক্রমে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, কিছু নৌকার মালিক, মাঝি-মাল্লা এবং স্থানীয়-রোহিঙ্গা দালাল চক্র অপহরণ ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী তিন হাজার ৫৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। এসব ঘটনায় উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১২০টি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পাচারের সময় সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে ২৬৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে, গত তিন বছরে টেকনাফে ৩৩০ জন অপহরণের শিকার হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাওয়া অনেক ভুক্তভোগী পরে মানব পাচারের শিকার হয়েছে।

অপহরণ অতঃপর সাগরপথে পাচার
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে মোস্তাক আহমেদ নামের এক ব্যক্তিকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। পরে পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দরকষাকষি শেষে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে তিন দিন পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, অপহরণ এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মুক্তিপণ দিতে না পারা অনেক ভুক্তভোগী পরবর্তী সময়ে পাচারের শিকার হন। তেমনই একজন কচুবনিয়ার মোহাম্মদ সাবের (৩২)। অপহরণের পর পাচারের শিকার এই ব্যক্তি জানান, অপহরণকারীরা তাঁকে পাহাড়ি আস্তানায় তিন দিন আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করে। পরে শামলাপুর উপকূল থেকে সাগরপথে একটি ট্রলারে তুলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। প্রায় চার বছর পর ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দেশে ফেরেন তিনি। নির্যাতনের কারণে তাঁর মাথা ও চোখে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, ফলে এখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন না।
টেকনাফের অনেক পরিবারেই এমন বেদনার গল্প রয়েছে। কেউ ভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন, আবার অনেকে ফিরতে পারেননি। তাদের শেষ ঠিকানা হয়েছে সমুদ্রের অতল গহ্বরে।

এক বছরে নিখোঁজ ৮০০ মানুষ
গত ১৬ জুলাই যৌথ বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর ও আইওএম জানিয়েছে, গত জুনে মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল থেকে যাত্রা করা রোহিঙ্গাবাহী দুটি নৌকা ডুবে ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির থেকে যাত্রা করা রোহিঙ্গারাও ছিলেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার সময় প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফরিদ উল্লাহ বলেন, সাগরপথে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো এখন অপহরণকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ অপহরণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একটি অপহরণকারী-মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকায় সন্ধ্যার পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় একা চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপণ না পেলে অনেককে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মামলা হয়, বিচার হয় না
মানব পাচারের ঘটনায় নিয়মিত মামলা হলেও অধিকাংশই বছরের পর বছর বিচারাধীন। পৃথক ট্রাইব্যুনালের অভাব, সাক্ষী সংকট ও দীর্ঘসূত্রতায় বিচার প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর পাচারকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

জেলা পুলিশ ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ৬০০টির বেশি মানব পাচারের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৮০টি এখনও বিচারাধীন। আইনে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের বিধান থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এই সুযোগে অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও মানব পাচার চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, কক্সবাজার মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হলেও পৃথক মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল চালু হয়নি। ফলে প্রায় ৫০০ মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকায় নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অপহরণ ও মানব পাচার রোধে আমাদের অভিযান চলমান। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, দ্রুত সময়ের মধ্য অনেক অপরাধী কারামুক্ত হয়ে
অপরাধে জড়াচ্ছে। অপরাধ দমনে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।’
অপহরণ ও মানব পাচার একই সূত্রে গাঁথা অপরাধ উল্লেখ করে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণের টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে অপহৃত ব্যক্তিদের পাচারের শিকার করার ঘটনাও পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘এসব অপরাধের আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনায় রেখে পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জড়িত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে অপহরণ ও মানব পাচার রোধে জনগণের সচেতনতা এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় এসব অপরাধ রোধ করা কঠিন। সুত্র,সমকাল

পাঠকের মতামত

কক্সবাজারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রমজানের বদলে কারাভোগ করা সোনা মিয়া জামিনে মুক্ত

‘আয়নাবাজি’র শিকার নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া অবশেষে কারামুক্ত হয়েছেন। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে কক্সবাজার জেলা ...

কক্সবাজারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা, স্থানীয় কর্মী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ

কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অন্যতম বেসরকারি সংস্থা ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ (জিকে)-এর ভারপ্রাপ্ত ...
Single Page Footer