ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৩/০৮/২০২৬ ৮:৪০ এএম

কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ওই মামলার আসামি প্রকৃত সোনা মিয়া নন। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। আর ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হয়েছে সেই পরিচয়ের প্রকৃত ব্যক্তিকেই।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী এসব তথ্য জানান।

আদালতের নির্দেশে সদর থানা পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একটি জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে ওই মামলায় তাকেই সোনা মিয়া হিসেবে আসামি করে বিচার চলে এবং পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।

এদিকে, রায়ের পর গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা প্রকৃত সোনা মিয়া দাবি করেছেন, তিনি ইয়াবা মামলার সঙ্গে জড়িত নন। তার আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে পুলিশের তদন্তে ২০২০ সালের গ্রেফতার ও ২০২৬ সালের গ্রেফতারের দুই ব্যক্তির পরিচয়, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্যেও ব্যাপক অমিল পাওয়া যায়।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি ২০২০ সালের ২ মার্চের। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে আসামিকে কারাগারে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হয়।

নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এ মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।

রায়ের পর গত ২৩ জুন র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেফতার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠান।

কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। কারাগারে থাকা সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।

গত ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে সদর থানা পুলিশ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।

পুলিশের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। কোনো এক সময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি দেখিয়েই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই সময়ের কারাগার-সংরক্ষিত তথ্যেও রয়েছে বড় ধরনের অমিল। ২০২০ সালে গ্রেফতার ব্যক্তির পিতার নাম মৃত নজির আহমদ, মাতার নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। ছেলে মোহাম্মদ আলী। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার সোনা মিয়ার পিতার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ থাকলেও তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে। কারণ তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই যখন উল্লেখ করেছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক নয়, তখন কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরে মামলার বিচার কার্যক্রমে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। পরবর্তীতে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

তার মতে, আদালতের নির্দেশে পুলিশের প্রতিবেদনে ২০২০ ও ২০২৬ সালের দুই ব্যক্তির তথ্যের মধ্যে পার্থক্য উঠে এসেছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

মামলায় গ্রেফতার সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি এবং কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা জানতে পারেন, এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবার একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন, রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিল বলে তারা জানতেন। অথচ এখন সেই মামলায় তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, আদালতের নির্দেশে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) মামলায় সোনা মিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে আদেশ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বেলা ২টা পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।

এদিকে, আদালতের আদেশের দিকে তাকিয়ে আছেন কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ও তার পরিবার। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, আসল রমজান কোথায় এবং তার পরিবর্তে কেন সোনা মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি হিসেবে কারাগারে থাকতে হচ্ছে? মামলার তদন্ত, আসামির পরিচয় যাচাই এবং আদালতে জামিন পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় কার গাফিলতি ছিল, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। সুত্র, জাগো নিউজ

পাঠকের মতামত

কক্সবাজারে হচ্ছে পর্যটন হাব,আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের

পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে সমন্বিত ...

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি অনুমতি ছাড়া ঘর নির্মাণ: ১০ দিনের কারাদণ্ড

কক্সবাজারের টেকনাফে নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে সরকারি অনুমতি ছাড়া ঘর নির্মাণের অপরাধে আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৬) ...

উখিয়া স্টেশন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হচ্ছেন জাহেদুল ইসলাম বাবু

উখিয়া স্টেশন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হচ্ছেন জাহেদুল ইসলাম বাবু   ...
Single Page Footer