প্রকাশিত: ১০/১১/২০১৭ ১০:২৭ পিএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ১১:২১ এএম

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ :”
সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে নোম্যানসলান্ডের সাত পয়েন্টে এখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়ে আছে। এসব পয়েন্ট হচ্ছে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে বড় ছেনখোলা, সাতমারাঝিরি, দু’ছড়ির বহির্মাঠ, কোনাপাড়া, পশ্চিমপুল এবং মংডুর দংখালি এবং উত্তর মংডুর কোয়াংচিবং। নাইক্ষ্যংছড়ি সংলগ্ন সীমান্তের ওপারের দশ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা এপার থেকে নিয়মিত ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে। চারটি এনজিও সংস্থা এদের কাছে নিয়মিত খাদ্যসহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। এরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপারে না আসার কারণ হিসেবে জানা গেছে নোম্যানসল্যান্ডে অবস্থান করে এপারের মতো ত্রাণ সহায়তা পাওয়া এবং পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দ্রুত নিজ এলাকায় অর্থাৎ রাখাইনে ফিরে যাওয়া। অপরদিকে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মংডুর দংখালি ও কোয়াংচিবং এলাকায় অবস্থিত রোহিঙ্গারা নৌ চলাচল বন্ধ থাকায় দ্রুত আসার সুযোগ পাচ্ছে না। যারা আসছে তারা ভেলাযোগে আসার পথকেই বেছে নিয়েছে। ইতোমধ্যে গত বুধবার সকালে ভেলাযোগে ৫২ জনের একটি রোহিঙ্গা দল টেকনাফে পৌঁছার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শেরপুরের নালিতাবাড়ির আড়াইআনি পুলিশ ফাঁড়ির ভিত্তিফলক উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, পূর্বে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৩০ নবেম্বরের মধ্যে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে। দু’দেশের পক্ষে সমসংখ্যক সদস্যদের নিয়ে গড়া ওয়ার্কিং গ্রুপই সিদ্ধান্ত নেবে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কখন রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নেয়া হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর রাখাইনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তার উন্নয়নেও এই ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করবে।

অপরদিকে আগামী ২৭ থেকে ৩০ নবেম্বর পোপ ফ্রান্সিসের মিয়ানমার সফরের কর্মসূচী রয়েছে। তার সফরের আগে মিয়ানমারের ক্যাথলিক নেতা কার্ডিনাল চার্লস মাউং বো রয়টার্সসহ বিদেশী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন, পোপ ফ্রান্সিস তার সফরে মুসলিম সংখ্যালঘুদের সহযোগিতাদানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ক্যাথলিক নেতা কার্ডিনাল চার্লস সফরকালে পোপ ফ্রান্সিসকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন এই বলে যে, এতে করে সে দেশের এনএলডি নেত্রী আউং সান সুচির অভিমত অনুযায়ী রোহিঙ্গা শব্দটি সেনাবাহিনী, সরকার ও জনগণের মাঝে উত্তেজনা ছড়াতে পারে। মিয়ানমার সফরের পর পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ সফরের কর্মসূচী রয়েছে।

ওপারের সূত্রগুলো জানিয়েছে, পার্বত্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সংলগ্ন সীমান্তের ওপারে যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় গেড়েছে তাদের মাঝে শিশু ও নারীদের বড় একটি অংশ অপুষ্টির শিকার। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম কোনাপাড়ার গদুরচরের খালের ওপারে জিরো পয়েন্টে যেসব রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়েছে সে এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে এদেশের গণমাধ্যম কর্মীদেরও যেতে দেয়া হয় না। তবে এনজিও কর্মীরা সেখানে ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে। তমব্রুখালীর ওপারে সন্নিহিত এলাকায় আইওএম, ডব্লিউএফপি, এনএসএফ ও মুক্তি নামের চারটি এনজিও সংস্থার কর্মীরা গত প্রায় আড়াই মাস ধরে সেখানে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

এদিকে উখিয়ার বালুখালির আশ্রয় শিবিরসহ অন্যান্য স্থায়ী পয়েন্ট মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাঢলে বেসামাল। এদের ঠাঁই করে দিতে প্রশাসন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এছাড়া শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে এ আশঙ্কায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে ২ লক্ষাধিক শিশুকে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দেয়ার টার্গেট করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব সিরাজুল আলম খান ও কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডাঃ আবদুস সালাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শিশুদের মাঝে শীত মৌসুমের নিউমোনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগেভাগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

অপরদিকে বৃহস্পতিবার নতুন করে কোন রোহিঙ্গা আগমনের তথ্য পাওয়া যায়নি। নাফ নদ ও সাগর এলাকায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় রোহিঙ্গাদের আগমন থমকে আছে বলে জানা গেছে। কিন্তু এরপরও ভেলাযোগে যে রোহিঙ্গাদের দলটি জীবনবাজি রেখে এপারে চলে এসেছে তা একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রিত কোন রোহিঙ্গা খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার কোন ঘটনা নেই। প্রকারান্তরে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা মিলছে। এসব ত্রাণ সামগ্রীর কিছু অংশ এপারের রোহিঙ্গারা ওপারের জিরো পয়েন্টে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া রোহিঙ্গা নিবন্ধন কার্যক্রম ইতোমধ্যে ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কিছু রোহিঙ্গা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পথে অন্যত্র চলে যাবার ঘটনাও ঘটছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের কড়া নজরদারির ও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কারণে আশ্রয় ক্যাম্পগুলো থেকে পালিয়ে যেতে অনেকে সাহস করছে না। আর যারা পালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে তারা একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ পথে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু রোহিঙ্গাকে উদ্ধার হয়ে পুনরায় ক্যাম্পে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।

সীমান্তের ওপারে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়ে গুরুতর জখম অবস্থায় পালিয়ে আসা বহু রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা পাচ্ছে। শঙ্কামুক্ত নয় এমন বহু রোহিঙ্গাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে ২২৯ জনকে। যার মধ্যে মারা গেছে ১৬ জন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে এখনও অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মিয়ানমার সরকার গত ২৫ আগস্ট রাত থেকে সেনা অভিযানের মাধ্যমে গণহত্যাসহ যে অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়েছে তাতে করে রোহিঙ্গারা ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় লাভের পর তারা নিজেদের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার পথ খুঁজে পেয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ সহায়তারও কোন অভাব নেই। শীত মৌসুম চলে আসায় আশ্রয় শিবিরগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা করছে তারা নিজেরা। কিন্তু সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে এখন থেকে শীতবস্ত্র বিতরণের তৎপরতা শুরু হয়েছে। বেসরকারী পর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিয়ত কম্বলসহ বিভিন্ন ধরনের শীতবস্ত্র পৌঁছানো হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে।

পাঠকের মতামত

ইউএনওর নির্দেশে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মচারীকে বেঁধে রাখল আনসার

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে এক পল্লী বিদ্যুৎ কর্মচারীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার ...