ad

যে কারনে ফিরতে চায় না রোহিঙ্গারা

আবদুর রহমান, টেকনাফ ::
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাড়ে তিন হাজারের প্রাথমিক তালিকা থেকে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) ও বুধবার (২১ আগস্ট) দুই দিনে দুই শতাধিক রোহিঙ্গার মতামত নেওয়া সম্পন্ন হয়। তবে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকলেও ফেরার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। সাক্ষাৎকারদাতারা জানায়, রোহিঙ্গা স্বীকৃতি ও ভিটেমাটি ফিরে না পেলে ফেরত যাবে না তারা। একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রসঙ্গেটিও ঘুরছে তাদের মুখে মুখে।

সকালে টেকনাফের শালবাগানে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মতামত জানিয়েছে জি-টু ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার (৩০)। ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কী কথা হলো জানতে চাইলে আনোয়ার জানান, ‘ন যাইয়ুম, ন যাইয়ুম (যাব না, যাব না)।’

মিয়ানমারে ফিরে যেতে এখন রাজি না জানিয়ে মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, ‘প্রাণে বেঁচে এখানকার ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছি, সেখানে গিয়ে আবার কেনো ক্যাম্পে থাকব, এটি হতে পারে না। সেদেশে জীবনের নিরাপত্তা, ভিটেমাটি, নির্যাতনের বিচার এবং রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ফিরতে রাজি আছি।’

প্রত্যাবাসনের জন্য সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেছেন, ‘দাবি মানা না হলে আমরা ফিরে যাবো না। প্রয়োজনে এখানে গুলি করে মেরে ফেলেন, তবুও ওপারে যাবো না। কেননা, সেখানে আইডিপি ক্যাম্পে এখনও রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি ভালো হয়নি, রোহিঙ্গাদের বন্দি রাখা হয়েছে। কোথাও ঠিকমতো চলাফেলা করতে দিচ্ছে না। যেসব রোহিঙ্গা সেদেশে রয়েছে, তাদের কোনও অধিকার নেই, কীভাবে বিশ্বাস করি- এখান থেকে যারা যাবে তারা নিরাপদ থাকবে?’

বুধবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এবং বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধিদের কাছে মতামত দিয়েছে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা দুইশ’ ওপর নারী-পুরুষ। এর আগের দিন ২১ জন মতামত দিয়েছিল। তবে কক্সবাজারে অবস্থানকারী ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমারের ছাড়পত্র পাওয়া তিন হাজার ৫৪০ জনের অনেকেই (যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন) রাখাইন রাজ্যে ফিরতে রাজি হয়নি বলে জানা গেছে। মতামত দিয়ে বের হওয়া রোহিঙ্গা সবাই প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছে।

একারণে আগামীকাল বৃহস্পতিবার যে ‘প্রত্যাবাসন’ হওয়ার কথা রয়েছে, সেটি অনেকটা অনিশ্চিতের মতো বলেও মনে করছেন রোহিঙ্গারা। এদিকে সরকারি কর্মকর্তারা প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে জানালেও চোখে পড়ার মতো তেমন কোনও প্রস্তুতি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ শরণার্থী ত্রাণ, প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি ও টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেছেন, ‘আজ (বুধবার) প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা দুইশ’র ওপরে রোহিঙ্গা তাদের মতামত দিয়েছে। সেগুলো একটি ফরমে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি আগামীকালও অব্যাহত থাকবে।’

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘আমরা চাই, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হোক। তবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন হলে আমরাও সহযোগিতা করতে রাজি আছি। তবে এই মূর্হুতে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনও পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। কেননা এখন পর্যন্ত সেদেশে যেসব রোহিঙ্গারা রয়েছে, তারা বন্দি জীবন পার করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি সময়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন পরির্দশনে আসা প্রতিনিধিদল আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা হবে প্রত্যাবাসনের বিষয়।’ তার আগে প্রত্যবাসন হলে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না বলেও তার ধারণা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা বলেন, ‘‘আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। যেটিকে আমরা ‘ইনটেনশ্যান সার্ভে’ বলছি। আগামী ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন হতে পারে কিনা বলা যাচ্ছে না, আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।’’

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনরাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়।

ad