তদন্তে উঠে এসেছে অজানা তথ্য

১০হাজার রোহিঙ্গার হাতে জাতীয় সনদ

এইচএম এরশাদ ::
নির্বাচন কমিশনের এত বেশী কড়াকড়ি সত্বেও রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র পায় কি করে। এই প্রশ্ন খোদ নির্বাচন কর্মকর্তার। এ নিয়ে গঠিত কমিটির তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। দালালদের হাত ধরে অন্তত ১০হাজার রোহিঙ্গা জাতীয় সনদ হাতিয়ে নিয়েছে।
জানা যায়, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয় পত্র বানিয়ে দেয়ার ইস্যুর কাজে জড়িত রয়েছে পুরনো রোহিঙ্গা নেতাসহ স্থানীয় একাধিক দালাল। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত তদন্ত টীম তাদের বিরুদ্ধে সরেজমিনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসারের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। এই কমিটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের রিপোর্ট জমা দিবেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০১৭সালের আগে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জাতীয় সনদ হাতে পেয়েছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় ভোটার তালিকাভূক্ত হয়েছে। ওইসব রোহিঙ্গা নিজেদের বাংলাদেশী নাগরিক দাবী করছে। যেমনটি দাবী করছে ক্যাম্পের বাইরে থাকা জাতীয় সনদধারী ১০হাজার রোহিঙ্গা। তারা নিজেদের নামে জমি কিনে দালান কোটা নির্মাণ শেষে স্থানীয় হিসেবে বসবাস করে চলেছে। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মন্তব্য করেছেন ওয়াকিবহাল মহল।
সূত্র মতে, ১৯৭৮সালে বিএনপি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ও ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে বেশীরভাগ রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের রোমালিয়াছড়া, তারাবনিয়াছড়া, পাহাড়তলী, পেশকারপাড়া, কলাতলী এলাকায় অন্তত ১০হাজার রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভূক্ত হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। তারা হাতিয়ে নিয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। পাহাড়তলী বর্মা পাড়া ও জিয়ানগর এলাকার একাধিক রোহিঙ্গা জানায়, যার কারণে আমরা বাংলাদেশী বাসিন্দা হবার সুযোগ পেয়েছি, তাকে ছাড়া জান কুরবান হলেও অর্থাৎ মৃত্যু চলে আসলেও অন্য কাউকে ভোট দিতে পারিনা। রাজার ভোটের সময় আসলেও আমরা ধানের শীষে ভোট প্রদান করে থাকি। উল্লেখ্য স্থানীয় এক বিএনপি নেতার তৎপরতায় পাহাড়তলী, হালিমাপাড়া, বর্মাপাড়া ও জিয়ানগর এলাকায় হাজারো রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভোটে তিনি বারবার পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আসছেন এ পর্যন্ত।
সূত্র জানায়, ১৯৭৮সালে পালিয়ে এসে প্রত্যাবাসনে ফাঁকি দিয়ে এদেশে থেকে যাওয়া অন্তত ১০হাজারের বেশী রোহিঙ্গা বিএনপি জামায়াতের কতিপয় নেতার মদদে ভোটার লিষ্টে নাম উঠানোর সুযোগ পেয়েছে। ওইসব পুরনো রোহিঙ্গারা দালালের মাধ্যমে তাদের স্বজনদের ভোটার হওয়া ও জাতীয় সনদ পাবার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। তাদের নাগরিকত্ব বাতিল ও দালান কোটাগুলো বাজেয়াপ্ত করে সরকারের কোষাগারে জমা করা দরকার হয়ে পড়েছে। আরাকান বিদ্রোহী গ্রুপের এইসব সন্ত্রাসীরাই ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও ভাসানচরে যাওয়া না যাওয়ার বিষয় নিয়ে তামাশা করছে।
জানা গেছে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের দোহাই দিয়ে বিদেশ থেকে অঢেল অর্থ এনে সামান্যটুকু রোহিঙ্গাদের বিতরণ করে সিংহভাগ বিদেশী অর্থ আত্মসাৎ করছে পুরনো রোহিঙ্গা ক্যাডাররা। হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে অর্থ এনে রোহিঙ্গাদের সামান্যটুকু বিলিবন্টনের ভিডিও ফুটেজ তৈরী করে ওই ভিডিও বিদেশে পাঠাচ্ছে পুরনো রোহিঙ্গা (আরএসও) নেতারা। আশ্রিত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলে ওই জঙ্গীদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্য তারা আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহসা প্রত্যাবাসনে রাজি না হওয়ার ও ভাসানচরে না যাবার ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজারে প্রশাসনের নিকট পাঠানো রোহিঙ্গা বান্ধব ৫১ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানূগ ব্যবস্থা না নেয়ায় রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভূক্ত করে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ইতোপূর্বে উচ্চ মহল থেকে প্রেরিত ওই তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান-মেম্বার, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম থাকায় রোহিঙ্গা বান্ধব ওই ৫১ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনার্থে পাঠানো নির্দেশনাটি ফাইল চাপা পড়ে রয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম বিভিন্ন ওয়ার্ডে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয় পত্র বানিয়ে দিচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে রয়েছে এলাকার স্কুল শিক্ষক, চৌকিদার, দফাদার ও জনপ্রতিনিধি। তাদের একজন স্কুল শিক্ষক সিরাজুল হক। তিনি দেশের প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অনেক রোহিঙ্গাকে ভোটার বানিয়েছে। নিজের আত্নীয় পরিচয়ে ভূয়া কাগজপত্র সৃজন করে নিজে শনাক্তকারী হিসেবে জাতীয় পরিচয় পত্র ইস্যু করার কাজে সহযোগিতা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় সিরাজুল হক তথ্য সংগ্রহকারীদের উপর দলীয় প্রভাব বিস্তার করে সীমান্তে অবস্থান করা বেশ কিছু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী হিসেবে জাতীয় পরিচয় পত্র করিয়ে দেয়ার জন্য অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সিরাজের বিরুদ্ধে ১৩ রোহিঙ্গাকে সহযোগিতার প্রমাণ মিলেছে
ঘুমধুম ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, রেজু আমতলীর মৃত আলী আহমদের পুত্র সিরাজুল হকের অনুরোধে আমি একজনের ভোটার ফরমে স্বাক্ষর করি। পরবর্তিতে জানতে পারি সে রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক। ঘুমধুম ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাবুল কান্তি চাকমা বলেন, বান্দরবান জেলা প্রশাসন ও কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নেতৃত্বে তদন্তে শিক্ষক সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে ১৩ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশী নাগরিকত্ব করার কাজে সংশ্লিষ্টতার সত্যতা মিলেছে। তৎমধ্যে আজিজুল হকের ছেলের বলে আমার কাছ থেকে একটি ফরমে মাস্টার সিরাজ স্বাক্ষর নেয়। সে যে রোহিঙ্গা তা আমি জানতাম না। বাকী ১২জনের ফরমেও সিরাজুল হকের সুপারিশের ভিত্তিতে অন্যরা স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে। এরা সবাই রোহিঙ্গা।
স্থানীয় চৌকিদার বদিউর রহমান বলেন, সিরাজুল হকের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা সহজে ভোটার হয়ে গেছে। এভাবে যদি রোহিঙ্গারা ভোটার হতে থাকে, তাহলে একদিন পুরো এলাকা রোহিঙ্গাদের দখলে যাবে। শিক্ষক সিরাজুল হক বলেন, আমি যাচাইকারী কিংবা শনাক্তকারী ছিলাম না, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একে জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেনেছি অনিয়মের মাধ্যমে কিছু সিন্ডিকেট সদস্যের সহযোগিতায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা জাতীয় পরিচয় পত্রধারী হয়েছে। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনসহ কয়েক স্তরের তদন্ত চলছে। কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসার ও তদন্ত কমিটির প্রধান এসএম শাহাদাৎ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির কাজে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে সরেজমিনে তদন্ত করেছি। তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী ৩০ অক্টোবরের পরে কমিশনকে রিপোর্ট হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।

Loading...
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন