সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং

টেকনাফের সারবাংয়ে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক পর্যটন নগরী। এতে থাকবে স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, প্যারাসেইলিং, জেট স্কিইং, পেডাল বোটিং, বিচ ভলিবল, বিচ বোলিংসহ পর্যটনের নানা অনুষঙ্গ যা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পর্যটনে উন্নত বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এ ছাড়াও পর্যটকদের সেবা দিতে গড়ে তোলা হবে একাধিক পাঁচ ও তিন তারকা মানের হোটেল ও নাইট ক্লাব

কক্সবাজার সৈকতের ঘোলা পানি নিয়ে আক্ষেপের দিন শেষ হতে চলেছে। সমুদ্রপ্রেমীদের জন্য সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে টেকনাফের সাবরাং এক্সক্লুসিভ টুরিস্ট পার্ক।

পর্যটন পার্কটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে, এটি চালু হলে কক্সবাজারের পর্যটন খাত আমূল বদলে যাবে।

বেজা জানিয়েছে, পর্যটনের জন্য বিশেষ এ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের প্লট বরাদ্দ শেষ, এখন চলছে ভূমি উন্নয়নের কাজ। সেটি শেষ হলেই স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

এই পর্যটন পার্কের পরিকল্পনা করা হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর। শুরুতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে এলাকাটি উন্নয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পরে দায়িত্ব পায় বেজা।

২০১৪ সালে কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে ৯৬৭ একর জমিতে এ পর্যটন পার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়। এটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা। তবে এতে দেশি পর্যটকরাও যেতে পারবেন। সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বে নির্মাণ হচ্ছে এই পার্ক।

দেশে বিদেশি পর্যটকের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সরকারি হিসেবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ বিদেশি নাগরিকের আনাগোনা থাকে। এর মধ্যে পর্যটক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীরাও। সরকার আশা করছে, সাবরাং পর্যটন পার্ক যাত্রা শুরু করলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।

বলা হচ্ছে, এই পার্কে প্রতিদিন পায় ৩৯ হাজার পর্যটক পর্যটন সেবা নিতে পারবেন।

নির্মিতব্য এই বিশেষ পর্যটন এলাকাটির অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার আর টেকনাফ থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের সাথে এলাকাটির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে অবস্থান বঙ্গোপসাগরের। কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে সাবরাং যেতে সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

এখন পর্যন্ত এই সাবরাং পর্যটন পার্কে বিনিয়োগ এসেছে ২৪ কোটি ডলারেরও বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে এ অঞ্চলে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক এক পর্যটন নগরী।

এতে থাকবে স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, প্যারাসেইলিং, জেট স্কিইং, পেডাল বোটিং, বিচ ভলিবল, বিচ বোলিংসহ পর্যটনের নানা অনুষঙ্গ যা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পর্যটনে উন্নত বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এ ছাড়াও পর্যটকদের সেবা দিতে গড়ে তোলা হবে একাধিক পাঁচ ও তিন তারকা মানের হোটেল ও নাইট ক্লাব।

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং
বেজার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মাঝ পর্যায়ের কাজগুলো চলছে। প্লট তো দেয়া হয়ে গেছে। ক্যানেলের কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে একটি প্রশাসনিক ভবন করছিলাম সেটার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

‘মাটি ভরাটের টেন্ডার ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার, সেটার পর্যবেক্ষণ চলছে। মাটি ভরাট হলেই আসলে ডেভেলপার যারা প্লট নিয়েছে তারা কাজ শুরু করে দেবে।’

সাবরাং পর্যটন পার্কটি তৈরি হয়ে গেলে পুরো কক্সবাজারের পর্যটন খাত বদলে যাবে বলে মনে করছে বেজা। মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এর কারণ হলো এটা সমুদ্রের কাছে। তারপর এটা আমরা পুরোটাই পরিকল্পিতভাবে করছি। এতে খোলা জায়গা থাকবে, ক্যানেল থাকবে, ভেতরে এমিউজমেন্টের ব্যবস্থা থাকবে। মানে একটা অত্যাধুনিক পরিকল্পনা করে আমরা সামনে এগুচ্ছি।

‘কক্সবাজারে যেটা হয়েছে, সেটা কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছে। যে যেভাবে পেরেছে, করেছে। এখানে কিন্তু সেটা না। প্লট দেয়া হলেও একটি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখেই ভবন করতে হবে। ভেতরে সবুজ বাতাবরণ থাকবে। পরিবেশটাই হবে অন্যরকম। যখন এটা চালু হবে, আমার মনে হয় পর্যটকরা অবশ্যই এখানে আসবে।’

সাবরাং থেকে মাত্র আধাঘণ্টায় যাওয়া যায় দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনস। এর ফলে পর্যটকরা দিনে গিয়ে দিনেই সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবেন। আর এতে ঝুঁকির মধ্যে থাকা সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ বৈচিত্রও রক্ষা পাবে।

মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখান থেকে আবার সেন্ট মার্টিন দেখা যায়, খুব কাছেই। এ কারণে এটিই হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এখানে আবার আমরা একটি ফটো কর্নার করেছি, ক্লক টাওয়ারের মতো।

‘এটা চালু হলে এই এলাকার অর্থনীতিই বদলে যাবে পাশাপাশি মানুষের রুচিতেও আমূল পরিবর্তন আসবে।’

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং
বিদেশি পর্যটকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হলেও এটিতে যেতে পারবেন দেশি পর্যটকরাও। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এটা এক্সক্লুসিভলি বিদেশি পর্যটকদের জন্য হবে না। যদিও এখন আমরা যে পলিসি তৈরি করছি তাতে বিদেশি পর্যটকই আমাদের মূল টার্গেট। বৈদেশিক মুদ্রা মূল টার্গেট। কিন্তু এর মধ্যে দেশিরা যে আসতে পারবে না তা না।

‘এখানে যে হোটেল রিসোর্টগুলো হবে, সেগুলোতে একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করা হবে। যেমন, যদি ধরা যায় রয়্যাল টিউলিপ হোটেল, এটাতে তো বিদেশি ও দেশি উভয় পর্যটকই থাকতে পারে। ঠিক এ ধরনের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করা হবে। ভেতরে যে কেউ যেতে পারবে, ঘুরতে পারবে। সুন্দর একটা গেট করছি, টেন্ডার হয়ে গেছে। যখন মূল কাজগুলো হয়ে যাবে, তখন বিনিয়োগকারীরা আসবে, কাজ করতে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই পর্যটনের বিকাশ হবে না, বরং মনোযোগ দিতে হবে ব্র্যান্ডিংয়ে।

পর্যটন বিষয়ক পত্রিকা বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহেদুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ রকম একটি পার্ক বা পর্যটন অঞ্চল যদি করা যায়, এটি নিঃসন্দেহে খুব ভালো একটি উদ্যোগ। তবে যে কোনো ভাল উদ্যোগকে সমর্থনের জন্য ভাল নীতিও থাকতে হয়। আমাদের দেশের ট্যুরিজম পলিসিটাই তো এখনও ঠিক হয়নি। পর্যটনের জন্য কোনো মাস্টারপ্ল্যানও নেই।

‘এই যে একটা ভাল জিনিস আমরা করছি, এটাকে মার্কেটিং কীভাবে করব? কীভাবে বিদেশি পর্যটকদের এখানে আসতে উদ্বুদ্ধ করব? আমরা কতটুকু সুযোগ সুবিধা দিতে পারব – এই বিষয়গুলোও একই সাথে ভাবতে হবে। দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের তো অনেক প্রডাক্ট রয়েছে, যেমন সুন্দরবন বা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত অথবা বুদ্ধিস্ট হ্যারিটেজ। কিন্তু এগুলো কি আমরা বিদেশিদের কাছে তুলে ধরতে পারছি?’

তিনি বলেন, ‘শুধু কিছু অবকাঠামো তৈরি করেই যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি, তাহলে কিন্তু সুফল পাওয়া যাবে না। পর্যটকবান্ধব একটি মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে, ব্র্যান্ডিং করতে হবে। সর্বোপরি পর্যটন খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।’ সুত্র: নিউজবাংলা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন