রোহিঙ্গা শিবিরে আতঙ্ক!

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ::
কোন কারণ ব্যতিরেকে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্রসমেত চৌকি স্থাপন করেছে। বাড়িয়ে দিয়েছে টহল তৎপরতা। সীমান্তের জিরো লাইন সংলগ্ন বিভিন্ন পয়েন্টে এ তৎপরতা লক্ষ্যণীয় হওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রিত উখিয়া টেকনাফের ৩২ শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে এখন যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে তারাও চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে। নতুন করে আবার কোন ক্লিনজিং অপারেশন চলে কিনা সে ভীতি পেয়ে বসেছে রোহিঙ্গাদের মাঝে।

মূলত গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সীমান্ত এলাকায় নতুন করে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে টহল তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় সীমান্তের এপারে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) টহলও জোরদার করা হয়েছে। অপরদিকে, অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটানোর বিষয়টি অবহিত করে মিয়ানমারের কাছে বিজিবির পক্ষ থেকে যে পত্র দেয়া হয়েছিল মঙ্গলবার তার উত্তর এসেছে। মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপ থেকে প্রেরিত এ পত্র বিজিবির রিজিওন কমান্ডারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এ উত্তরে কি বলা হয়েছে তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। উল্লেখ্য, পতাকা বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়ে বিজিবি মিয়ানমার শান্তিরক্ষী বাহিনীর কাছে গত রবিবার পত্র প্রেরণ করেছিল।

এদিকে এ ঘটনায় সীমান্তের এপারে সাধারণ মানুষ কিছুটা উৎকণ্ঠায়। তবে আতঙ্কিত নয়। কিন্তু এপার এবং ওপারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত অত্যাচারে বর্তমানে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় রয়েছে। প্রত্যাবাসনের চুক্তি করেও মিয়ানমার পক্ষ তা থেকে সরে আছে। এছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চলছে। এ বিচার কার্যক্রম বাংলাদেশের কক্সবাজারের স্থানান্তরের প্রস্তাবও করা হয়েছে ইতোমধ্যে।

এদিকে, পার্বত্য নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তের ওপারে রাখাইনের তুমব্রু এলাকায় মঙ্গলবার ভোর থেকে হঠাৎ ভারি অস্ত্রসহ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও টহল জোরদার করা হয়েছে বলে ওপারের সূত্রগুলো জানিয়েছে। সীমান্তের ওপারে বাইশফাঁড়ি এলাকাসহ আশপাশে নতুন করে সবুজ রঙের তাঁবু টাঙ্গিয়ে তাঁবুর উপরিভাগে সবুজ পাতার আবরণ দিয়ে অস্থায়ী চৌকি স্থাপন করেছে মিয়ানমারের সেনারা। বিনা উস্কানিতে মিয়ানমার সৈন্যদের এ ধরনের আচরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। এ আতঙ্ক বিস্তৃত হয়েছে শূন্যরেখায় অবস্থানরত প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গার মাঝেও। মঙ্গলবার সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয় লোকজন ও সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা এসব তথ্য জানানোর পাশাপাশি তাদের ভয়ভীতি, উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কথা ব্যক্ত করেছেন বলে সেখানকার সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

অপরদিকে বিজিবি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। রবিবার সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাদের সন্দেহজনক গতিবিধি দৃশ্যমান হওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ ওয়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে প্রতিবাদ করা হয়। বাংলাদেশ শান্তি চায় মর্মে দু’দেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক উল্লেখ করে মিয়ানমারকে এ ধরনের আচরণ থেকে সরে আসার অনুরোধও করা হয়। কিন্তু মিয়ানমার পক্ষ তাদের অনেকটা একগুঁয়েমি তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

কক্সবাজার-৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ জানিয়েছেন, আমরা আমাদের টহলসহ কার্যক্রম আরও জোরদার করেছি। আর সীমান্তে বিজিবি সদস্যসহ সকলকে সতর্ক অবস্থানে রেখেছি। নতুন অনুপ্রবেশসহ অনাকাক্সিক্ষত কোন ঘটনা ঘটলে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। ওদের এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধিসহ সেনাদের উপস্থিতি আছে সেটি আমরা জেনেছি।

এদিকে সীমান্তের লোকজন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ তুমব্রু, ঘুমধুম, চাকমাপাড়া ও বাইশারি সীমান্ত থেকে ওপারে যানবাহন- লোকজনের চলাচল ও সেনা-বিজিপির (বর্ডার গার্ড পুলিশ) টহল তৎপরতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্তে সেনাবাহিনীকে তৎপর দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় অধিবাসী ও জিরো লাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে কয়েকদিন ধরে সীমান্তের তুমব্রু থেকে লেবুছড়ি পর্যন্ত এলাকায় এপার থেকে প্রতিদিন মিয়ানমার সেনা সদস্যদের নানা তৎপরতার দৃশ্য চোখে পড়ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিজিপির পোশাক পরে সেখানে অবস্থান করছে বিধায় আমাদের সন্দেহ দানা বেঁধেছে। তারা সেখানে তাঁবু টাঙ্গিয়ে নতুন অস্থায়ী চৌকি স্থাপন করেছে, যা আগে ছিল না। এর আগেও বেশ কয়েকবার সীমান্তে সেনা টহল বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছিল। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারা সেখানে ভারি অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করেছে। সীমান্তের এপার থেকেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শূন্যরেখায় বাস করা রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা দিল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, দুই দিন ধরে তুমব্রু সীমান্তে সরকারী গাড়ি চলাচল বেড়ে গেছে। যারা আসা-যাওয়া করছে তারা পুলিশ নাকি সেনাবাহিনী সেটি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছেনা। কোনারপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের লোকজন ভয়ে আছে।

ওপারের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তুমব্রু, কুমিরখালী, নাপ্পুরা, হায়াংপ্রাণ, রোয়াইদং, পাইনখালী, পতেজা, সাহাব বাজার ও ফকিরা বাজার এলাকায় সেনা সদস্যরা অবস্থান নিয়েছে। সূত্র আরও জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি, রাখাইনের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) দমন এবং মিয়ানমারে আগামী ৮ অক্টোবর নির্বাচনসহ রাখাইনে মিয়ানমার সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আরাকান বিদ্রোহী বাহিনীর হেফাজতে থাকা দুই সেনা রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকারোক্তি দেয়ায় সে দেশের সেনাদের এই তৎপরতা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আমাদের দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যাচ্ছে। একজন ইউপি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, মিয়ানমারে আগামী অক্টোবর মাসে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। হয়তো নির্বাচনকে ঘিরে যাতে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য তাদের এই তৎপরতা।

টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মোঃ ফয়সল হাসান খান জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সেনা সমাবেশ ও তাদের সন্দেহজনক গতিবিধির কথা জেনেছি। তবে সীমান্তে সেনা টহল বৃদ্ধির বিষয়টি কতটুকু সত্য তা নিশ্চিত নই। তবে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
সুত্র: জনকন্ঠ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন