বাংলাদেশী হোস্ট কমিউনিটি জনগনের প্রতি কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুব সমাজের খোলা চিঠি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প
প্রিয় বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা,
আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে এবং তার-ও আগে মায়ানমার থেকে প্রাণ রক্ষার জন্য পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রতি আপনাদের উদার এবং নিঃস্বার্থ আশ্রয়দান, খাবার-পানিয় এবং পরিষেবা দেওয়ার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, আইন শৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদান এবং সুষ্ঠ ত্রাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কভিড-১৯ মহামারীর কঠিন সময়ে ও রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ সরকার একজন মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছে। আপনাদের সবার মহান সহায়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ এবং চির কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

সম্প্রতি করোনাভাইরাস মহামারীতে যখন বাংলাদেশ ও বিশ্ব এক কঠিন সময় পার করছে ঠিক এই মূহূর্তে আশ্রয় শিবিরে অপ্রত্যাশিত সহিংসতা ও সংঘাত গুলো বাংলাদেশী জনগণ ও সরকারকে খুব-ই বিরক্ত করেছে। আমরা সাধারণ রোহিঙ্গা তার জন্য হতাশ এবং গভীরভাবে দুঃখিত। আমরা রোহিঙ্গারা সকল অন্যায়, সন্ত্রাস ও সহিংসটাকে তীব্র নিন্দা জানাই। রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী জনগণের সুরক্ষা এবং দ্বন্দ্ব থামাতে বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় ভূমিকায় আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মানবতাবাদী বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা,
আপনারা জানেন প্রতিটি সমাজে ভালো লোকের পাশাপাশি কিছু মন্দ লোক বাস করে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায় তার বেতিক্রম নয়। কিন্তু সমাজের সেই গুটি কয়েক খারাপ লোকের জন্য জনগুষ্টির সকলকে ঘৃণা করা কি উচিত? আমরা বিশ্বাস করি রোহিঙ্গাদের ৯৫ শতাংশ মানুষ শান্তিপ্রিয় যারা এই দুষ্কৃতিকারীদের বিতাড়নের জন্য সংগ্রাম করছে। আপনাদের প্রতি বিনীত প্রশ্ন, আপনারা যদি নির্দোষ রোহিঙ্গাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তবে কি শান্তি মিলবে? শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করতে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা জনগুষ্টিকে এক সাথে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের আগমনে বাংলাদেশী জনগণের অনেক অসুবিধা হচ্ছে। আমরা তা বুজতে পারি। কিন্তু খারাপ লোকদের দমন, সন্ত্রাস দুরিকরণ ও শান্তি স্থাপনে সবাইকে এক সাথে সক্রিয় ভুমিকা পালন করার কি কোন বিকল্প আছে? ঘৃণা, হিংসা, রেষারেষি ও নির্দোষ মানুষকে দোষারোপ কখনো সহিংসতা, অস্থিতিশীলতা ও দ্বন্দ্বগুকে সমাধান করতে পারে না। মার্টিন লুথার কিং, জুনিয়র বলেছেন “অন্ধকার কখনো অন্ধকারকে তাড়িয়ে দিতে পারে না; কেবল আলোই তা করতে পারে। ঘৃণা কখনো ঘৃণাকে তাড়াতে পারে না; কেবল প্রেমই তা করতে পারে “।

হে শান্তি প্রিয় বাংলাদেশী বন্ধুরা,
আমরা সবাইকে ঘৃণা, ক্ষোভ ও বৈষম্যের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও বুদ্ধিভিত্তিক পন্থা বেছে নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে চাই। শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সংহতি, সম্প্রীতি ও ঐক্য দরকার। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রতি আপনাদের সহযোগিতা একন্ত দরকার। তবেই আমরা আমাদের সমাজ থেকে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও অশান্তি দূর করতে পারব। সমাজের খারাপ লোকগুলো তখন প্রশ্রয় পাবে না। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রদর্শনের পরিবর্তে, সমাধানের জন্য ঐকান্তিকতা ও উদারতার সাথে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পরস্পরিক যোগাযোগ ও আলাপ আলোচনার সময় এসেছে। বুকের মধ্যে বৈরিতার আগুনে পোড়ার চেয়ে শান্তি জন্য পরস্পরের সাথে আরও বেশি পরিচিত হওয়ার সময় এসেছে। একে অপরকে নিরবে দোষ দেওয়া আমাদের বৃহত্তম ব্যর্থতা। এভাবে আমরা কখনই শান্তিকে আলিঙ্গন করতে পারব না। মানুষ মানুষকে ভালবাসতে ভুলে গেলে, শান্তি অধরা রয়ে যাবে। অশান্তির বেদনা আমরা বুজি। আমাদের সকলকে একে অপরের দুঃখ-কষ্ট বুজার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে একটি সুন্দর সামাধান আসবে, সবার জীবন বাঁচিয়ে দেবে, আগামীর কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠব।

রোহিঙ্গাদের প্রতি উদারতা ও ভালবাসার জন্য সারা দুনিয়াতে বাংলাদেশীরা প্রশংসিত। আপনারা মানব প্রেমের দৃষ্টান্ত। আপনাদের এই প্রেম, মহানুভবতা ও সহযোগিতার শুধু ক্যম্পে শান্তি আনবে না বরং একদিন মায়ানমার সরকারের অত্যাচার ও অন্যায়ের দূর করে শান্তিপুর্ণ প্রত্যাবাসনে সাহায্য করবে।

কৃতজ্ঞতায়
একঝাক রোহিঙ্গা তরুণ, কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন