দৃষ্টি ঘোরাতেই সেনা টহলের অপকৌশল মিয়ানমারের

করোনা মহামারির মধ্যেই আবার আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গা সংকট। চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের সন্দেহজনক সেনা টহল এ আলোচনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সাম্প্রতিককালে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক চাপে পড়েছে। এই চাপ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের স্নায়ুর ওপরে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তারই প্রতিফলন রাখাইনে তাদের নতুন করে সেনা সমাবেশ এবং সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ করে সেনা টহল। মিয়ানমারের এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির নেতিবাচক চরিত্রকেই প্রকট করে তুলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে বাংলাদেশ। সীমান্তে সন্দেহজনক সেনা টহলের বিষয়টি নজরে আসার পর ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তুরস্ক সফরে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সফরে যাওয়ার আগে এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, পুরো এলাকার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তত বাড়ছে। দ্রুত এ সংকটের নিরসন হওয়া জরুরি।
যেভাবে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ : ২০১৭ সালে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং নিষ্ঠুরতার পর ওই সময় প্রায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর নজিরবিহীন নিষ্ঠুরতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে। পরে জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও এই চিত্র তথ্য-প্রমাণসহ বিস্তারিতভাবে প্রকাশ পায়। এরপর থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নানা মাত্রায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর অপতৎপরতা থেমে থাকেনি। বরং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বাইরে রাখাইন নৃগোষ্ঠীর ওপরও মিয়ানমার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা বিস্তৃত হয়। ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃস্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবিও

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে উপেক্ষিত হয়। এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, তারা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চায় না এবং নানা কৌশলে প্রত্যাবাসন ঠেকিয়ে রাখতে চায়। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া সে দেশের দুই সেনা সদস্য আন্তর্জাতিক আদালতকে ২০১৭ সালের গণহত্যা ও নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দেন। এই বর্ণনার ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফর্টিফাই রাইটস। এর পরই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়। একইভাবে রাখাইন নৃগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসে।
একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, দুই সেনা সদস্যের আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার বাহিনীর নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মিয়ানমার নতুন করে বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। রাখাইন অভিযানে গণহত্যা ও গণ নিষ্ঠুরতার অভিযোগের সাফাই গাইতে গিয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এর আগে বারবার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। কিন্তু এবার দুই সেনা সদস্যের আন্তর্জাতিক আদালতে দেওয়া বর্ণনা থেকে মিয়ানমার যে রাখাইনে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কঠোর বিধি-নিষেধের মুখে পড়তে পারে, এমন সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। এই দুশ্চিন্তা থেকেই মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ফেরাতে রাখাইনে নতুন করে সেনা সমাবেশ এবং সীমান্তে সন্দেহজনক সেনা টহল শুরু করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের অভিমত।
সূত্র আরও জানায়, এর আগেও রোহিঙ্গা সংকটকে পাশ কাটাতে মিয়ানমার নানা অজুহাতে সীমান্তে উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই সেসব উস্কানিমূলক অপচেষ্টার বিপরীতে বাংলাদেশ যথেষ্ট কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও প্রশংসা পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত :সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর সমকালকে বলেন, মিয়ানমার কেন সীমান্তে সেনা টহল বাড়াচ্ছে, তারা আসলে কী চাচ্ছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা যায়, রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ চলছে এবং এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার সেখানে সেনা সমাবেশ আরও বাড়াতে পারে। আর কভিড-১৯ এর কারণে একধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সীমান্তে সেনা টহল শুরু করতে পারে। কারণ মিয়ানমার কভিড-১৯ এর বিস্তৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সীমান্তপথে যাওয়া-আসার মাধ্যমে যেন মহামারি পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে সে কারণেও সীমান্ত রক্ষীর পাশাপাশি সেনা টহল শুরু করতে পারে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমার তাদের আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছার বিষয়টি এখন পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি। রাখাইনে এখনও যে পরিস্থিতি তা কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। এ সময়ে মিয়ানমারের সেনা সমাবেশ ও সেনা টহলের মতো বিষয়টি আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, যতটা বোঝা যায়, এই সেনা সমাবেশ এবং সেনা টহল মিয়ানমারের একটা অপকৌশল। রোহিঙ্গা সংকট থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্যই তাদের এই অপকৌশল। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই সেনা সদস্যের রাখাইনে গণহত্যার বর্ণনা দেওয়ার পর বিশ্বের সামনে বড় ধরনের বিরূপ সমালোচনা এবং ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে মিয়ানমার। এ অবস্থা থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে মিয়ানমার সীমান্তে সন্দেজনক সেনা টহল শুরু করেছে, এটা বোঝা যায়। কারণ এর আগেও তারা সীমান্ত ঘিরে এ ধরনের উস্কানি একাধিকবার দিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের উস্কানিকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং দৃঢ় কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছে। এই সেনা টহল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নেতিবাচক ভাবমূর্তিকেই প্রকট করবে।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার বাহিনী রাখাইনে এখনও নিষ্ঠুরতা বন্ধ করেনি। সেখান থেকে নিষ্ঠুরতার খবর নানাভাবে আসছে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সংকট কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সমাধানে কাজ করছে। এবারও মিয়ানমার সীমান্তে সন্দেজনক সেনা টহল শুরু করার পর কূটনৈতিক রীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা মিয়ানমারকে জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে নিজের দেশে যত দ্রুত সম্ভব ফিরে যাক। এ জন্য বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আরও আগেই চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি মিয়ানমার। তারা রোহিঙ্গাদের আস্থাও অর্জন করতে পারেনি। এ জন্য এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ঘিরে উদ্বেগ তত বাড়বে। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সুত্র: সমকাল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন