দখলের কারণে অস্তিত্ব সংকটে কক্সবাজারের নদীগুলো

শাহীন মাহমুদ রাসেল ::
কক্সবাজারের প্রধান চারটি নদীই পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গভীরতা ও প্রশস্ততা কমার পাশাপাশি কমছে এর খরস্রোতা। এতে পানিশূন্য হয়ে হারিয়ে ফেলছে নাব্যতা।

কক্সবাজারের প্রধান চারটি নদী হলো বাঁকখালী, নাফ, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী। এসব নদী কক্সবাজার জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ চারটি নদীই পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গভীরতা ও প্রশস্ততা কমার পাশাপাশি কমছে এর খরস্রোতা। এতে পানিশূন্য হয়ে হারিয়ে ফেলছে নাব্যতা।

পাশাপাশি ভরাট অংশটুকু ছাড়াও কয়েক শ’ কোটি টাকার সরকারী সম্পদ প্রতিযোগিতামূলকভাবে দখল করে নিচ্ছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালীরা। এক সময়ের প্রমত্তা বাঁকখালী, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী নদী এখন চিকন খালে পরিণত হয়েছে।

কোথাও কোথাও এ নদীর বুকজুড়ে দেখা দিয়েছে ধু-ধু বালুচর। প্রায় স্রোতহীন নদীগুলোর পাশেই অগভীর নলকূপ স্থাপন করে এখন চাষ হচ্ছে আবাদি ফসল। অথচ এক সময় নদীগুলো দিয়ে চলাচল করত বড় বড় নৌযান। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য আনা-নেয়ার জন্য এসব নদীই ছিল একমাত্র পথ। কালের বিবর্তনে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব নদী এখন ইতিহাস।

ফুলেশ্বরী, মাতামুহুরী, নাফ ও বাঁকখালী নদী স্রোতহীন হয়ে পড়ায় বর্ষায় নদীর বুকে জমা পলি অপসারিত হয় না। ফলে প্রতি বছর জেগে উঠছে ছোট-বড় চর। এতে নদী হারিয়ে ফেলছে নাব্য। নদীর দু’পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করা হচ্ছে রাতারাতি। এতে নদীর প্রস্থতা হ্রাস পাচ্ছে। সচেতন মহল ও পরিবেশ বিশারদদের মতে, উচ্ছেদ অভিযানই নদীগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারে পূর্বের অবস্থায়।

পরিবেশ বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে দু’ভাবে নদী বিপর্যয় হয়। অভ্যন্তরীণ ও বহিঃদেশীয়। অভ্যন্তরীণ কারণগুলো হলো নদীর বুক ও পাহাড়ে জমি দখল, চাষাবাদ, স্থাপনা নির্মাণ, খালের পাড় কাটা, পাথর ও বালু আহরণ, বাঁক কেটে গতিপথ পরিবর্তন, সেচ খাল তৈরি, পানি সরিয়ে নেয়া, কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বোল্ডার নির্মাণ, বিরতিহীন বাঁধ নির্মাণ, নদীর ওপর বাঁধ-সেতু-জলবিদ্যুত প্রকল্প জলাধার বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, নদীর পানিতে বোল্ডার ও পাথর নিক্ষেপ, গাছ-গাছালির ফাঁদ স্থাপন, পানিতে অতিরিক্ত কচুরিপানা, উন্নয়নের নামে পাড়ের গাছ কাটা, নদীপাড়ে নৌযান ভাঙ্গা ও নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ, নদীর পানিতে শহুরে ও গ্রামীণ শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক সার-কীটনাশক নিক্ষেপ, মিশ্রণ ইত্যাদি।

আর বহিঃদেশীয় বিষয়গুলো হলো বাংলাদেশে প্রবেশকারী প্রায় সবগুলো নদীই ভারতীয় ও মিয়ানমার অংশে হওয়ায় সেসব দেশ নদীর ওপর বৃহৎ স্থাপনা বাঁধ, সেচ বা পানিবিদ্যুত প্রকল্প। এসব নদীর এখন বিপর্যন্ত অবস্থা। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর চাষাবাদের কারণে নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

কক্সবাজার জেলার ঐতিহ্যবাহী এ নদীসমূহের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সবকটি নদীই দীর্ঘমেয়াদী, অবারিত ও ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ের শিকার। নদীগুলোর পানির পরিমাণ ও প্রবাহ হ্রাস, নদীর কলেবর সঙ্কোচন, তলা ভরাট, পাড় ভাঙ্গন, দিক পরিবর্তন, নদীর বুকজুড়ে ব্যাপক চর সৃষ্টি, বর্ষায় প্লাবন ও শীতে খরা, নদীসংশ্লিষ্ট খাল-বিল-হাওড়ে পানির পরিমাণ হ্রাস বর্তমানে নদী সঙ্কটের সাধারণ রূপ। এ চারটি নদীর দুই পাশের বেশিরভাগ স্থানে সবুজের সমারোহ। যদিওবা নাফ নদীর এক প্রান্ত মিয়ানমার অভ্যন্তরে। অপর তিনটি নদীর দুই পাড়ে স্থায়ীভাবে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে মানুষ। নদীর পাশে গড়ে ওঠা সবুজ গ্রামের দুই পাশ দিয়ে পানির স্রোতে চকচকে টিন আর খড়ের ঘর। নদীর পাশে স্থাপনা আর মানুষের বসতি কি কেউ চায়? এ পর্যন্ত কেউ চিন্তাও করেননি নদী কেন শুকিয়ে গেল? পানির অভাবে নদীর বুকে অব্যাহত বসতি গড়তে থাকলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত এবং জীববৈচিত্র্যের কী হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের মানচিত্রে। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। এরই মধ্যে এসব নদীর সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে মূল নদীর সংযোগ। অনেক নদীই এখন কৃষিজমিতে পানি নেয়ার নালার মতো দেখা যাচ্ছে বললে চলে। নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদীপাড়ের অনেকেই আজ বাড়িহারা, জমিহারা। তবুও নদীর মতো মাতৃস্নেহে আগলে থাকতে চায় এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের ধারণা, নদী বিলীন হলে পরিবেশ ও জলবায়ুর বিপর্যয় ঘটবে।

ad